কালিগঞ্জ (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি: ডিসিআর না পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ১২ লক্ষ টাকা হজম করতে আদালতের আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মনোয়ারা খাতুন নামে এক বৃদ্ধার নাম ভাঙিয়ে অসহায় পরিবারের জমি সন্ত্রাসী কায়দায়, গ্রাম্য পুলিশ বাহিনী নিয়ে জবর দখলের পায়তারার অভিযোগ উঠেছে ইউপি চেয়ারম্যান শওকত হোসেনের বিরুদ্ধে।
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার ধলবাড়িয়া ইউনিয়নের দেবাড়িয়া গ্রামে বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১২ টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নিতে চেয়ারম্যান ঐ বৃদ্ধাকে দিয়ে ৯৯৯ ফোন দিয়ে পুলিশকে ঘটনাস্থলে নিয়ে এ দখলের পাঁয়তারা চালায়।
তবে ভুক্তভোগীদের প্রতিবাদের মুখে তারা ওই জমি দখল করতে না পেরে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। এর আগেও ওই জমি দখল নিতে যেয়ে সন্ত্রাসী কায়দায় বাড়ির নারী ,পুরুষ ও শিশুদের বেধড়ক পিটিয়ে জখম করে শওকত বাহিনী। এ ঘটনায় মাফুজা, জাহানারা নামে দু,জনকে জখম করে হাসপাতালে পাঠায়। এরমধ্যে মাহফুজা নামে এক গর্ভবতী নারীর ভ্রুণ হত্যার ঘটনায় তারা থানায় অভিযোগ দিলেও পুলিশ মামলা নেয়নি। উল্টো ওই বৃদ্ধা মনোয়ারা বেগমকে দিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নিকট পাল্টা অভিযোগ করে প্রতিপক্ষদের জায়গা দখল নিতে। চেয়ারম্যান শওকাত প্রভাব খাটিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে দিয়ে নোটিশ করিয়ে গত ৩১ জানুয়ারি ওই অসহায় পরিবারকে অফিসে ডেকে জমি ছাড়ার হুমকি , ধামকি দিয়ে তাড়িয়ে দেয়।
এর আগেও মৃত বয়স্ক ভাতার কার্ডের টাকা তুলে খাওয়ার অভিযোগে দুদুকে মামলা রয়েছে চেয়ারম্যান শওকতের বিরুদ্ধে। এছাড়াও গত কয়েক মাস আগে নিজের বোনের জমি জাল, জালিয়াতির ঘটনায় দুদকের মামলায় জেল হাজত খেটে বর্তমানে জামিনে আছে।
এদিকে, খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার বেলা ২ টার দিকে সরেজমিনে সাংবাদিকরা গেলে ভুক্তভোগী দেবাড়িয়া গ্রামের আব্দুল হামিদ, শাহজাহান গাজী, শফিকুল ইসলাম, আব্দুল কাদের সহ একাধিক নারী পুরুষ সাংবাদিকদের জানান, সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার দেবাড়ীয়া মৌজার চাদকাটি এস এ ৩ নং খতিয়ানের ১,২,৩ এবং ৪ দাগে ১৪.৮০ একর জমি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ হাসনাবাদ থানার দৌলত গাজী ও আয়মন বিবি বাংলাদেশের গিরিশ চন্দ্র সরদার, ভীম সরদার, অর্জুন সরদার, হেমনাথ সরদার, যতীন্দ্রনাথ সরদারের ১৩৭১ সালের বিনিময় আইনে ভারতীয় রাষ্ট্রের জমি-জমার বিনিময়ে গত ১৫/৬/১৯৬৪ ইং তারিখে কেস ভুক্ত জমির মালিকানা লাভ করেন। সেখান থেকে দৌলত গাজী বসবাস করা অবস্থায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রা:) খুলনা আদালতে বিনিময় ৬৭৪/৬৯-৭০ নং কেস করেন। উক্ত কেসের রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম চলমান অবস্থায় দৌলত গাজী মারা যান।
পরবর্তীতে তার ৪ পুত্র যথাক্রমে শাহাদাত গাজী, সাহাজ উদ্দিন গাজী, আমানত আলী গাজী, দাউদ আলী গাজী এই জমির মালিক হন। পরবর্তীতে ওই ৪ ভাই জমির মালিকানা থাকাবস্থায় তৎকালীন জেলা বিভক্ত হয়ে সাতক্ষীরায় স্থানান্তরিত হওয়ায় সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের নিকট বিনিময় ভ্যালিট করার জন্য রিপোর্ট প্রদান করেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কালিগঞ্জ গত ১৬-২-১৯৮৬ তারিখে কেসভুক্ত জমি কাউকে ইজারা দেওয়া হয়নি বিনিময়কারীরা ভোগ দখলে আছেন এভাবে রিপোর্ট প্রদান করেন। পরে কেসের সময়সীমা শেষ হওয়ায় কেসটি স্থগিত হয়ে যায়।
২০০৫ সালে কেসটি আবার চালু হওয়ায় গত ৯/৪/২০০৫ ইং তারিখে প্রতিবেদন চাইলে সেটা দেওয়ার আগেই মামলার বাদী শাহাদাত গাজী মৃত্যুবরণ করেন। যে কারণে সম্পত্তিটি "খ"তফসিল ভুক্ত হওয়ায় ২ নং ক্রমিকে ১৪৮৩৭৬ নং লিখিত হইয়া গেজেট প্রকাশিত হয়।১০/১০/১৩ ইং তারিখের গেজেটে "খ"তফসিল হতে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়।
পরে তার ভাই শাহাদাত গাজী কেসটি পরিচালনা করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার অসহায়ত্বের সুযোগে চেয়ারম্যান শওকত গংরা অফিসের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাদের মোটা অংকের টাকা দিয়ে "ক"তালিকাভুক্ত করে ৮/৭৪-৭৫ ইজারা কেস সৃষ্টি করে "খ" তফসিল সম্পত্তি হিসেবে ১৩/২/২০১৭ ইং তারিখে দখলে না থাকা সত্বেও চেয়ারম্যান শওকত ২০১৬ সালে সাতক্ষীরার সুলতান পুরের মিলন নামে এক আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীর নামে ডি সি আর নিয়ে ভয়-ভীতি ও মীমাংসার নাম করে চেয়ারম্যান শওকত ৪ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয় বলে ভুক্তভোগীরা জানান।
উক্ত ভুয়া ডিসিআর কেসের বিরুদ্ধে সাতক্ষীরা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আদালতে গত ৩০/৮/১৭ ইং তারিখে ডিসি আর বাতিলের জন্য মামলা করা হয়। বিষয়টি পরবর্তীতে আদেশ বাতিলের জন্য গত ৩/১২/২৩ ইং তারিখে খুলনা বিভাগীয় কমিশনার রাজস্ব আদালতে মিস আপিল ৪-১৮/২৪(সাতক্ষীরা) দায়ের করা হয়।
বর্তমান মামলাটি ঢাকা তেজগাঁও আদালতে চলমান আছে। এই সুযোগ শওকাতের সন্ত্রাসী বাহিনীরা দখলের পায়তারা চালালে ভুক্তভোগীরা গত ২০/১১/২৫ ইং তারিখে সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আব্দুল হামিদ বাদী হয়ে গোবিন্দপুর গ্রামের নুরালি গাজিরপুত্র আব্দুস সাত্তার, নুরুল ইসলাম এবং মৌখালী গ্রামের আব্দুর রশিদ গাজীর পুত্র ও মনোয়ারা বেগমের পালিত পুত্র শফিকুল ইসলামকে বিবাদী করে ১৫৪ ধারায় ১৯৯৬/২৫ (কালী) নং একটি মামলা দায়ের করেছে। মামলাটি তদন্তের জন্য উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি কালিগঞ্জকে নির্দেশ দিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দৌলত গাজীর চার পুত্রের মধ্যে নিঃসন্তান অবস্থায় দাউদ আলী গাজী তার স্ত্রী মনোয়ারা বেগমকে রেখে মারা যায়। দাউদের নিজের নামে নয় বিঘা জমি থাকে সে মারা যায় তার স্ত্রী দুই আনা অংশ অর্থাৎ ৩৮ শতক জমির মালিক হয়।
এছাড়াও দাউদ আলী গাজী বেঁচে থাকতে স্ত্রী মনোয়ারার নামে তিন বিঘা জমি কিনে দেয়। চাচা ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে না জানিয়ে তার মধ্য থেকে দেড় বিঘা জমি বিক্রি করে দেয়। বাকি ১.৫ বিঘা জমি পার্শ্ববর্তী শেরকাঠি গ্রামের আব্দুর রশিদ গাজীর পুত্র শফিকুল ইসলামের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে লিখে বাকি দেড় বিঘা জমি চিকিৎসা খরচের নামে নোটারি পাবলিকের স্ট্যাম্পের মাধ্যমে লিখে দিয়েছে বলে শফিকুল ইসলাম দাবি করলেও তার সত্যতা মেলেনি।
এদিকে জমি বিক্রি বাবদ ১২ লক্ষ টাকা শফিকুল ইসলামের নিকট থেকে চেয়ারম্যান শওকত হোসেন নিয়ে নেয়। এবং এই শফিকুল ইসলামকে ব্যবহার করে মনোয়ারা খাতুন কে ভুল বুঝিয়ে ম্যানেজ করে টাকা এবং জমি আত্মসাৎ করা এবং ডি সি আরের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য পালিত পুত্র শফিকুল এবং মরিয়মকে দিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ এবং জমি দখলের পায়তারা চালাচ্ছে। এছাড়াও সাতক্ষীরা জজ আদালতে উক্ত জমি নিয়ে দেবাড়িয়া গ্রামের মৃত শাহাদাত হোসেন গাজীর পুত্র কন্যারা যথাক্রমে শাহজাহান, আলমগীর, রমেশা ,আমেনা, তাহমিনা শাহানারা বাদী হয়ে পৃথক ৩ টি মামলা দায়ের করেছে।
মামলাগুলো হলো দেওয়ানি ৩৮৬/ ২৫, ৪২৩/২৫, ৪২৪/ ২৫ নং মামলাগুলো বর্তমান চলমান থাকা অবস্থায় থানা পুলিশ বা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নোটিশ করা নিয়ে আদালত অবমাননার শামিল বলে ভুক্তভোগীদের আইনজীবী সাংবাদিকদের জানান।
তবে চাচা বেঁচে থাকতে বিষয়গুলো সামনে আসেনি কিন্তু মারা যাওয়ার পরে বিষয়গুলো সামনে আসায় আসল, নকল নিয়ে ধোঁয়াশার জট বেধেছে। আর এদিকে চিকিৎসার জন্য মোটা অংকের টাকা খরচের নাম করে নোটারি পাবলিকের স্ট্যাম্পের স্বাক্ষর এবং জমি বেচা নিয়ে পরিবারের মধ্যে যেকোনো সময় রক্তক্ষয় সংঘর্ষ জড়িয়ে পড়তে পারে। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে চেয়ারম্যান শওকত হোসেন মনোয়ার বেগম এবং তার পালিত পুত্রকে ব্যবহার করে বিভিন্ন দপ্তরে মিথ্যা অভিযোগে হয়রানি করে আসছে।
এ ব্যাপারে ঘটনার সত্যতা জানতে চেয়ারম্যান শওকতের নিকট জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের জানান, আমি জমি দখল করতে যাইনি, আমি দেখতে গিয়েছিলাম। তবে তার বাহিনী নিয়ে সেখানে জমি দখলের বিষয়ে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে বসন্তপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার নুরুল ইসলামের নিকট জানতে চাইলে তিনি জানান, আমি নতুন এসেছি বিষয়টি তদন্ত করে বিজ্ঞ আদালতে রিপোর্ট প্রদান করবো।
সম্পাদক : রেহেনা মেহেদী
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। Dainik Aporadh Barta