কালিগঞ্জ (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের ধলবাড়িয়া ইউনিয়নে পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে সরকারের দেওয়া দুস্থ ও অসহায় মানুষের ভিজিএফ (VGF) খাদ্যশস্য (চাল) বিতরণে চরম অনিয়ম ও চুরির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রত্যেক উপকারভোগীর ১০ কেজি করে চাল পাওয়ার কথা থাকলেও, সেখানে অসহায় মানুষদের দেওয়া হচ্ছে সাড়ে ৮ থেকে ৯ কেজি চাল। প্রকাশ্যেই গরিবের মুখের গ্রাস কেটে নেওয়ার এই উৎসবে মেতেছে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা।
আজ ২৪ মে (রবিবার) সকালে ধলবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদে মোট ৭৯৪ জন উপকারভোগীর মাঝে ৭,৯৪০ কেজি চাল বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু শুরু থেকেই চলে ওজনে কম দেওয়ার মহোৎসব।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ধলবাড়িয়া ইউনিয়নে মোট উপকারভোগীর সংখ্যা ৭৯৪ জন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ১০ কেজি করে তাদের মোট ৭,৯৪০ কেজি চাল পাওয়ার কথা। কিন্তু ভুক্তভোগীরা গড়ে সাড়ে ৮ কেজি করে চাল পাচ্ছেন। সেই হিসাবে ৭৯৪ জন উপকারভোগী চাল পাচ্ছেন মাত্র ৬,৭৪৯ কেজি। অর্থাৎ, উপকারভোগীদের বরাদ্দ থেকে এক দিনেই কেটে রাখা হচ্ছে ১,১৯১ কেজি চাল। সরকারের বর্তমান চাল ক্রয়ের বাজারমূল্য প্রতি কেজি ৪৯ টাকা হিসেবে, মাত্র এক বেলাতেই অসহায় গরিব মানুষের প্রায় ৫৮,৩৫৯ (আটান্ন হাজার তিনশত ঊনষাট) টাকার চাল সরাসরি আত্মসাৎ করা হচ্ছে।ডিজিটাল বাংলাদেশে যখন ডিজিটাল স্কেলে ওজন মাপার নিয়ম, তখন ধলবাড়িয়া ইউনিয়নে চাল মাপা হচ্ছে বালতি দিয়ে! ওজনে কম দেওয়ার অভিনব এই কারসাজি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
নন্দীকাটি গ্রামের উপকারভোগী রাবেয়া খাতুন চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন: "ওজনে যে কম দিচ্ছে, সেটা তো আমরা সাধারণ মানুষ বুঝি না। আমাদের বালতি মেপে চাল দিচ্ছে, আমরা অসহায় মানুষ তা নিয়েই বাড়ি চলে যাচ্ছি। কিন্তু পরে মেপে দেখি চাল অনেক কম!"
ওজনে কম দেওয়ার বিষয়টি ধামাচাপা দিতে ইউপি সদস্য ও চেয়ারম্যান একেক সময় একেক অদ্ভুত যুক্তি দাঁড় করাচ্ছেন। ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য গোলাম ফারুকের দাবি, বালতি দিয়ে মাপার কারণে নাকি সামান্য এদিক-ওদিক হচ্ছে। তিনি বলেন, "আমরা বালতি মেপে চাল দিচ্ছি, দুই-একশ গ্রাম কম হতে পারে।"
ধলবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত হোসেন ওজনে কম দেওয়ার বিষয়টি সরাসরি স্বীকার করে নিয়েছেন, তবে দোষ চাপিয়েছেন চাল পরিবহন ও বস্তার ওপর। তার ভাষ্য "আমরা সাড়ে ৯ কেজি করে চাল দিচ্ছি। ১০ কেজি করে দেওয়ার কথা থাকলেও দূর থেকে চাল আনতে গিয়ে এবং বস্তায় কম থাকার কারণে আমরা ৫০০ গ্রাম করে কম দিচ্ছি।"
জনপ্রতিনিধিদের এমন প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে যে, সরকারি নির্দেশনাকে তোয়াক্কা না করে গরিবের চাল কেটে রাখাটা সেখানে একটি নিয়মিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
সরকারি চাল বিতরণের সময় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগের নিয়ম থাকলেও ধলবাড়িয়া ইউনিয়নে তা কেবলই খাতা-কলমে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্যাগ অফিসার ও উপজেলা জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোঃ জুয়েল হোসেনের ভূমিকা নিয়ে চরম প্রশ্ন উঠেছে। নিজের ব্যর্থতা ও দায়িত্বহীনতা স্বীকার করে তিনি বলেন "আমি ধলবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদে পৌঁছানোর আগেই তারা চাল বিতরণের কাজ শুরু করে দিয়েছে। তাই এ বিষয়ে আমি কিছুই বলতে পারব না।"
সচেতন মহলের প্রশ্ন, ট্যাগ অফিসারের অনুপস্থিতিতে কীভাবে সরকারি চাল বিতরণ শুরু হলো? তিনি পৌঁছানোর আগেই কেন বিতরণ শুরু হলো, আর চাল চুরির এই মহোৎসবে তিনি কেন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছেন, তা নিয়ে এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ভিজিএফ চাল বিতরণে এমন নজিরবিহীন অনিয়ম ও চুরির বিষয়ে কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মিলন সাহাকে তাৎক্ষণিকভাবে অবহিত করা হলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ইউএনও বলেন "এই মাত্র আপনার (সাংবাদিক) কাছ থেকে বিষয়টি শুনলাম। চাল কম দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমরা এখনই খোঁজ নিয়ে এই ব্যাপারে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিচ্ছি।"
পবিত্র ঈদের মুখে সরকারের মানবিক সহায়তা কর্মসূচীকে এভাবে কলঙ্কিত করার পেছনে জড়িত ধলবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান, সংশ্লিষ্ট মেম্বার এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন ট্যাগ অফিসারের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্তপূর্বক কঠোর আইনি ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন কালিগঞ্জের সর্বস্তরের সাধারণ জনগণ ও সুশীল সমাজ।
সম্পাদক : রেহেনা মেহেদী
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। Dainik Aporadh Barta