নিজস্ব প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার তালা উপজেলার গোপালপুর গ্রামে এক শিক্ষক দম্পতির বিরুদ্ধে সুদের ফাঁদে ফেলে একাধিক পরিবারকে নিঃস্ব করার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, সুদের টাকা দেওয়ার নামে কৌশলে ফাঁকা চেক ও স্ট্যাম্প নিয়ে পরবর্তীতে মামলা দিয়ে তাদের সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে কেউ ভিটেমাটি হারিয়ে পথে বসেছেন, আবার কেউ জীবন বাঁচাতে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। কেউ আবার ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সাতক্ষীরার তালা উপজেলার গোপালপুর গ্রামের সন্তোষ কুমার দত্ত’র ছেলে শিক্ষক পরেশ কুমার দত্ত এবং তার স্ত্রী তালা গোপালপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সাধনা রানী মিত্র। তারা দুজনেই এ সুদের ব্যবসা করে আসছে। পরেশ কুমার দত্ত সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঘোনা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক।
তালার গোপালপুর গ্রামে ঘটনাস্থলে গেলে স্থানীয়রা অভিযোগের সুওে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা সুদের ব্যবসার আড়ালে গ্রামের অসহায় ও সহজ-সরল মানুষদের টার্গেট করে আসছেন এবং গ্রামের সহজ সরল অসহায় মানুষকে উপকারের নামে সুদের ফাঁদে ফেলে তাদেও নিঃস্ব করছেন শিক্ষক পরেশ-সাধনা দম্পত্তি।
গোপালপুর গ্রামের কার্তিক চন্দ্র বিশ্বাস জানান, জরুরি প্রয়োজনে তিনি শিক্ষক পরেশ কুমার দত্তের কাছ থেকে এক লক্ষ টাকা সুদে ধার নেন। সে সময় তাকে একটি স্বাক্ষর করা ফাঁকা চেক ও স্ট্যাম্প দিতে বলা হয়। কার্তিক তার স্ত্রী দীপালী বিশ্বাসের নামে একটি ফাঁকা চেক ও স্ট্যাম্প দেন। পরবর্তীতে তিনি সুদসহ সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করলেও সেই চেক ও স্ট্যাম্প আর ফেরত পাননি।
কার্তিক আরো অভিযোগ করে, পরে ওই ফাঁকা চেক ও স্ট্যাম্পে ১২ লক্ষ টাকা লিখে তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা হয় (যার সি,আর মামলা নং- ৭১/২২) এবং একতরফা রায়ে তার স্ত্রী দীপালী বিশ্বাসকে এক বছরের কারাদন্ড ও ১২ লক্ষ টাকা জরিমানা দন্ডে দন্ডিত করা হয়। মামলা সম্পর্কে তারা কিছুই জানেনা। রায় ঘোষণার পরে জানতে পারলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। বর্তমানে দীপালী বিশ্বাস গ্রেফতার এড়াতে পলাতক জীবনযাপন করছেন।
স্থানীয়রা জানান, এমন ঘটনা একাধিক রয়েছে। একই গ্রামের সোবহান নামের এক ব্যক্তি দেড় লক্ষ টাকা ধার নেওয়ার পর তা পরিশোধ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধেও মামলা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাব খাটিয়ে একতরফা রায় নেওয়ার পর সোবহানকে চাপ দিয়ে তার ভিটাবাড়ি পরেশের নামে রেজিস্ট্রি করে দিতে বাধ্য করা হয়। এর কিছুদিন পরই সোবহান স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। বর্তমানে তার পরিবার চরম দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছে এবং ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছে।
শুধু দিপালী বা সোবহান নন, একই কৌশলে সলেমান নামের আরও একজন ব্যক্তি সর্বস্বান্ত হয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, সুদের নামে টাকা দিয়ে পরে ফাঁকা চেক ও স্ট্যাম্প ব্যবহার করে মিথ্যা মামলা দিয়ে মানুষকে নিঃস্ব করার একটি চক্র গড়ে তুলেছেন ওই শিক্ষক দম্পতি।
এব্যাপারে সলেমানের স্ত্রী পরেশের সুদের ব্যবসার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, আমার স্বামী সলেমান ওই টাকা নিয়েছিল। পর্বর্তীতে আমার স্বামীর সাথে ডিভোর্স হয়ে যায়। কিন্তু ডিভোর্সের পরও আমি স্বাক্ষী হওয়ায় আমার কাছ থেকে জোর পূর্বক সে সুদে আসলে টাকা আদায় করে নেয়।
এরিপোর্ট লেখার সময় দুপুর ২টা ১৩ মিনিটে শিক্ষক পরেশ কুমার দত্ত’র মোবাইল নম্বরে কল করলে তিনি রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এব্যাপারে তালা উপজেলা নির্বাহী অফিসার তারেক হাসানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ প্রতিনিধিকে জানান, শিক্ষক পরেশ কুমার দত্ত’র সুদের কারবারের কথা আমার জানা নেই। তবে কেউ যদি অভিযোগ করে তাহলে তদন্ত করে দোষী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ঘটনায় এলাকায় চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। ভুক্তভোগীরা প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, শিক্ষা পেশার আড়ালে এ ধরনের প্রতারণা বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আরও অনেক নিরীহ পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হবে এবং ওই দম্পত্তিকে বিচারের আওতায় এনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরসহ প্রশাসনের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সম্পাদক : রেহেনা মেহেদী
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। Dainik Aporadh Barta