জি এম আমিনুল হক: বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর। গায়ের চামড়া কুঁচকে গেছে, চোখে ঝাঁপসা দেখেন। হাঁটতে গেলে লাঠিতে ভর করেও পা কাঁপে । শতবর্ষী আছিয়া বেগমের অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটে টিনের ছোট্ট কুঁড়েঘরে। বয়স্ক ভাতার মাত্র ছয়শো টাকায় চলছে জীবনের চাকা।
বিধবা আছিয়া বেগম যেন পল্লী কবি জসিমউদদীনের আসমানী কবিতার আসমানীদের প্রতিচ্ছবি। আছিয়া বেগম সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের নাথপাড়ার এক নির্জন পাড়ায় বাস করেন। স্বামী ময়েজউদ্দিন ঢালী মারা গেছেন আরও ২০বছর আগে। দুই ছেলের অভাবের সংসার আর অসুস্থতায় ঠাঁই হয়নি বৃদ্ধ মায়ের। আর দুই মেয়ে স্বামীর সংসারে অভাব অনটনের মধ্যে দিনযাপন করছে। একাকী এই বৃদ্ধার বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল সরকারের বয়স্ক ভাতার ৬০০ টাকা।
২০জুন সকালে এ প্রতিনিধি সরেজমিনে গিয়ে দেখা মিললো টিনের ভাঙা চোরা ছোট্ট কুঁড়ে ঘরের সামনে ভাঙা শরীর নিয়ে বসে আছে বৃদ্ধা আছিয়া বেগম। ঘরটিতে ঢুকতেই চোখে পড়ে জীর্ণশীর্ণ অবস্থা। চালের টিন ভাঙাচোরা আর মরিচায় খসে খসে পড়ছে,একটু বর্ষাতে ঘরে পানি পড়ে। বেড়ার ফাঁক দিয়ে হু হু করে ঢোকে বাতাস। শীত-গ্রীষ্মে সমান কষ্ট। ঘরের ভেতর একটা চৌকি, ছেঁড়া কাঁথা আর দু-একটা মাটির হাঁড়ি। রান্নার চুলাটাও ভাঙা। ঘরের সামনে বসে আছে বৃদ্ধা আছিয়া বেগম। দুচোখে তার কোন রকমে বেঁচে থাকার করুণ আকুতি।
এসময় তিনি জানান, শরীর আর চলে না বাবা। কোমরে ব্যথা, হাঁটুতে ব্যথা। উঠতে-বসতে কষ্ট হয়,” কাঁপা কাঁপা গলায় বলেন আছিয়া বেগম। “ভাত রাঁধতে গেলে দম ফুরায়ে যায়। কেউ নেই যে একটু পানি তুলে দেবে।
প্রতি তিন মাস পরপর বয়স্ক ভাতার ১৮০০ টাকা পান তিনি। মাসে গড়ে ৬০০ টাকা। এই টাকায় চাল, ডাল, তেল, ওষুধ—কিছুই হয় না। “চালের কেজি ৭০ টাকা। ৫ কেজি চাল কিনলেই ৩৫০ টাকা শেষ। বাকি টাকায় কী খাব? ওষুধ কিনব কী দিয়ে?” প্রশ্ন করেন তিনি।
প্রতিবেশী কামরুল ইসলাম জানান, “চাচি প্রায়ই না খেয়ে থাকেন। আমরা মাঝে মাঝে ভাত তরকারি দিয়ে আসি। কিন্তু নানান ব্যস্থতায় সবসময় তা হয়ে ওঠে না। রোজ দেওয়া সম্ভব হয় না।
বয়সজনিত কারণে নানা রোগে ভুগছেন আছিয়া বেগম। উচ্চ রক্তচাপ, বাতের ব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখেন। ডাক্তার দেখানোর টাকা নেই। বলতে বলতে চোখ ভিজে আসে তার।
একসময় স্বামী-সংসার ছিল। দিনমজুর স্বামীর সাথে মাঠে কাজ করতেন। এখন শুধুই স্মৃতি হয়ে আছে তার।
আছিয়া বেগমের এখন একটাই চাওয়া—দুমুঠো ভাত আর মাথার ওপর একটা নিরাপদ ছাদ। “মরণের আগে যদি একটা পাকা ঘর পেতাম, শান্তিতে মরতে পারতাম,” বলেন তিনি। “আর তিন বেলা খেতে পারলেই হবে। বেশি কিছু চাই না।”
প্রতিবেশীরা জানান, রাতে ঝড়-বৃষ্টি হলে বৃদ্ধা ভয়ে কাঁদেন। টিনের চাল উড়ে যাবে কি না, সাপ-পোকা ঢুকবে কি না—এই আতঙ্কে ঘুমাতে পারেন না। গত কালবৈশাখীতে ঘরের একপাশের বেড়া ভেঙে গেছে। পলিথিন টানিয়ে কোনোমতে আছেন।
শতবর্ষী এই মায়ের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সমাজের বিত্তবান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, প্রবাসীরা চাইলে তার জন্য স্থায়ী থাকার ঘর তুলে দিতে পারেন। মাসিক কিছু বাজার-সদাইয়ের ব্যবস্থা করলে অনাহার ঘুচবে। উপজেলা প্রশাসন চাইলে তাকে ‘আশ্রয়ণ-২’ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে দুই কক্ষের সেমিপাকা ঘর দিতে পারে।
রাষ্ট্র বয়স্কদের জন্য ভাতা চালু করেছে, এটা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু ৬০০ টাকায় ২০২৬ সালের বাজারে একজন মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটে না। আছিয়া বেগমের মতো হাজারো বৃদ্ধ-বৃদ্ধা আছেন যারা লোকচক্ষুর আড়ালে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। তাদের খুঁজে বের করে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় আনা জরুরি।
একজন শতবর্ষী মা যদি অনাহারে রাত কাটান, ভাঙা ঘরে আতঙ্কে দিন গোনেন তবে আমাদের উন্নয়নের গল্প অপূর্ণ থেকে যায়। আসুন, আছিয়া বেগমের মুখে হাসি ফোটাই। তার শেষ বয়সটা অন্তত নিশ্চিন্তে কাটুক।
সম্পাদক : রেহেনা মেহেদী
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। Dainik Aporadh Barta