স্পোর্টস ডেস্ক: এমন ‘অপবাদ’ ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে লিওনেল মেসিকে শুনতে হতো। সে হিসেবে ব্রাজিলে একগাদা ‘মেসিদের’ উপস্থিতি আছে। রাফায়েল দিয়াজ বেওলি ওরফে রাফিনিয়া তাদেরই একজন।
‘ক্লাবে পারফর্ম করছেন, সেটা জাতীয় দলে গেলে সে পরিসংখ্যানটা একই রকম থাকছে না’ — সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখ রাখলে সেলেসাও সমর্থকদের উষ্মার সুরটা থাকে এমনই। তবে এখানে একটা শুভঙ্করের ফাঁকি আছে। ব্রাজিলের হয়ে এখন পর্যন্ত দুটো বড় টুর্নামেন্ট খেলেছেন, তবে ২০২৪ কোপা আমেরিকায় তার করা একটা গোলই এখন পর্যন্ত দলটির হয়ে দুই টুর্নামেন্টে তার একমাত্র অবদান।
ফাঁকিটা হচ্ছে, ২০২৪ কোপার আগ পর্যন্ত রাফিনিয়া আর তার পরে শেষ দুই মৌসুমের রাফিনিয়ার মধ্যে পার্থক্য আকাশ আর পাতালের। সেই কোপা শেষ করে এসে বার্সেলোনায় নতুন কোচ হানসি ফ্লিককে পেলেন, এরপরই যেন নিজেকে পুরোপুরি মেলে ধরতে শুরু করলেন। ঘরোয়া ডাবলের সঙ্গে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালের খুব কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন দলকে। সে মৌসুম শেষে ব্যালন ডি’অরের সংক্ষিপ্ত তালিকাতেও ছিল তার নাম, শেষ দিন পর্যন্ত সম্ভাবনা ছিল গ্রহের সেরা ফুটবলার বনে যাওয়ার।
যে সময়টার কথা বলা হচ্ছে, সেই সময়টাতে তিনি ব্রাজিলের হয়ে খেলেছেন ১০ ম্যাচ। সেলেসাওদের জার্সি গায়ে সবচেয়ে ভালো সময়টাও এই সময়ই কাটিয়েছেন তিনি। ৪ গোল করেছেন, একটি করিয়েছেন। বার্সেলোনায় তিনি নিয়মিতই খেলেন লেফট উইংয়ে, জাতীয় দলে ভিন্ন ভিন্ন কোচের অধীনে সে ভূমিকাটাও বদলে গেছে, খেলতে হয়েছে ডান পাশের উইংয়ে। কোচ বদল, ভূমিকায় বদলসহ এত সব ঝক্কি সামলে ৪ গোল, ১ অ্যাসিস্টের পরিসংখ্যান নিশ্চয়ই মন্দ কিছু নয়!
সবকিছু পক্ষেই ছিল। তবে বাধ সাধল চোট। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটের কারণে ব্রাজিলের শেষ ৬ ম্যাচের ৫টিতে খেলতে পারেননি তিনি। সবশেষ যে চোটটা পেয়েছেন, সেটাও এই ব্রাজিলের জার্সিতেই।
হ্যামস্ট্রিংয়ের এই চোট চলতি মৌসুমেও তাকে বারবার বাধা দিয়েছে। মৌসুমের শুরুতে চোটে ছিলেন, এরপর ফিরে এসেছেন, আবারও চোটে পড়েছেন… ২০২৫-২৬ মৌসুমে তার গল্পটা এমনই; সব মিলিয়ে ১১২ দিন মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছে তাকে। তবে এর মাঝেও তিনি যখনই সুযোগ পেয়েছেন, সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন; ২৩ ম্যাচ মিস করেছেন, বাকি যে ৩১ ম্যাচে খেলেছেন, তাতেই করেছেন ১৯ গোল আর ৮ অ্যাসিস্ট।
বার্সেলোনায় তিনি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বোঝাতে একটা পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। মার্চ পর্যন্ত বার্সেলোনা চলতি মৌসুমে রাফিনিয়াকে মাঠে নিয়ে জিতেছে ৮৫ শতাংশ ম্যাচে। আর যেসব ম্যাচে রাফিনিয়া নেই, সেই সব ম্যাচে জয়ের হারটা নেমে এসেছে ৫৮ শতাংশে। এই পরিসংখ্যান কাকতালীয় নয় নিশ্চয়ই!
ব্রাজিল ঐতিহাসিকভাবে পেলে, গারিঞ্চা, জিকো, সক্রেটিস, রোনালদো ফেনোমেনন, রোনালদিনহোর মতো শিল্পীদের দল। দলটাও বিখ্যাত তাদের ‘জোগো বনিতো’ বা ‘সুন্দর খেলা’ মূলমন্ত্রে।
সেই মানদণ্ডে রাফিনিয়া বড্ড বেমানান। উইঙ্গার হলেও বল পায়ে পেলে তাকে আপনি ৩ জন ডিফেন্ডারকে ছিটকে ফেলতে দেখবেন না, ড্রিবল করে প্রতিপক্ষ রক্ষণে ত্রাসের রাজত্বও কায়েম করতে দেখবেন না।
তবে তিনি যা করেন, আধুনিক ফুটবলে সেটাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। দলের প্রেসে নেতৃত্ব দেন, প্রতিপক্ষের জাল দৃষ্টিসীমায় চলে এলে রেহাই দেন না মোটেও।
ব্রাজিল জোগো বনিতোতেই আটকে থাকুক, কোচও তা চান না। কার্লো আনচেলত্তি কখনো ‘সুন্দর ফুটবল’ খেলানোর জন্য বিখ্যাতও ছিলেন না। তার মুন্সিয়ানা লুকিয়ে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারে।
রিয়ালের হয়ে শেষ দুটো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ই তার সাক্ষ্য দেয়। দুবারই তার দলের প্রধান অস্ত্র ছিলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, তবে দুবার তার দল ব্যবহার করেছে ভিন্ন দুটো কৌশল। ২০২২-এ ভিনির সঙ্গে জুটি বেধেছিলেন কারিম বেনজেমা, ২০২৪ সালে দায়িত্বটা গিয়ে বর্তেছিল জুড বেলিংহামের কাঁধে।
আনচেলত্তির সেই অস্ত্র ভিনি ব্রাজিলেও আছেন। ফর্ম আর খেলার ধরন বলছে ব্রাজিলে এই বেনজেমা/বেলিংহামের বক্সে উপস্থিতির ভূমিকাটা পালন করতে পারেন রাফিনিয়া।
ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে এবারই প্রথম যাচ্ছেন না রাফিনিয়া। ২০২২ বিশ্বকাপে কাতারেও তিনি খেলেছেন। তবে ৩১৭ মিনিট খেলেও সেবার গোলের দেখা পাননি। সেবার অবশ্য ফর্মটা পক্ষে ছিল না। বড় মঞ্চের চাপ কী করে সামলাতে হয়, সেটাও জানা ছিল না। এবার পরিস্থিতিটা পুরোপুরি উল্টো। ফর্ম পক্ষে কথা বলছে, শেষ দুই মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন্স লিগে জানান দিয়েছেন, বড় মঞ্চ পেলেই বরং তিনি দ্বিগুণ দ্যুতি ছড়ান।
বিশ্বকাপের মঞ্চটা আরও বড়। এবার তবে চৌগুণ বা তার চেয়েও বেশি দ্যুতি ছড়ানোর পালা রাফিনিয়ার!
সম্পাদক : রেহেনা মেহেদী
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। Dainik Aporadh Barta