প্রিন্ট এর তারিখঃ নভেম্বর ৪, ২০২৬, ১:৩২ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ নভেম্বর ৪, ২০২৬, ৪:২৬ অপরাহ্ণ
নিজস্ব প্রতিনিধি: সাতক্ষীরায় স্ত্রীর সঙ্গে ধারণ করা ব্যক্তিগত ও আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবির ঘটনায় সমালোচিত কন্টেন্ট ক্রিয়েটর আব্দুল্লাহ আল মামুনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাতে সাতক্ষীরা সদর থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার চন্ডিপুর গ্রাম থেকে ওই কন্টেন্ট ক্রিয়েটর আব্দুল্লাহ আল মামুনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতার হওয়া কন্টেন্ট ক্রিয়েটর মামুন মাদক ও নারী কেলেঙ্কারীতে চাকরিচ্যুত হওয়া বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সাবেক সদস্য ও চন্ডিপুর প্রি-ক্যাডেট স্কুলের পরিচালক করিম উল্লাহ মাস্টারের ছেলে।
এদিকে গত ১ নভেম্বর দায়ের করা মালায় সখিপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি জিসান বাবুলকে প্রধান আসামী করে এ মামলা করেছেন দেবহাটা উপজেলার নওয়াপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও বর্তমানে সাতক্ষীরার বাসিন্দা সাহেব আলী। ওই মামলায় কন্টেন ক্রিয়েটর আব্দুল্লাহ আল মামুনকে ২য় আসামী এবং ভুক্তভোগীর ২য় স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস (মৌসুমি) কে ৩য় আসামী করা হয়। এছাড়া আরো ২/৩ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামী করা হয়েছে।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, প্রায় ছয়-সাত মাস আগে পারিবারিক কারণে নিজের স্ত্রীকে তালাক দেন ভুক্তভোগী। পরে ওই নারীর সঙ্গে অভিযুক্তদের পরিচয় ও যোগাযোগ হয়। অভিযোগ রয়েছে, ভুক্তভোগীর অজান্তে দাম্পত্য জীবনের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ও ছবি ধারণ করে রাখেন তার সাবেক স্ত্রী। পরবর্তী সময়ে ওই ভিডিও অভিযুক্তরা সংগ্রহ করে ভুক্তভোগীকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠান।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, গত ১৫ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে অভিযুক্তরা হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও পাঠিয়ে বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। তাদের কথা না শুনলে বড় ধরনের ক্ষতি করার হুমকিও দেওয়া হয়। পরে ২০ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টার দিকে আবারও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
এ ছাড়া গত ২৯ অক্টোবর বিকেল ৪টার দিকে ‘সখিপুর ইউনিয়ন ছাত্রদল’ নামের একটি ফেসবুক আইডি এবং ১ নভেম্বর দুপুর ২টার দিকে অভিযুক্ত আব্দুল্লাহ আল মামুনের নিজস্ব ফেসবুক আইডি থেকে ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও প্রকাশের অভিযোগ করা হয়েছে। এতে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন ও মানহানির শিকার হচ্ছেন বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী।
এ ঘটনায় এজাহারে অভিযোগের বিষয়ে বিভিন্ন ভিডিও, স্ক্রিনশট ও অডিও রেকর্ডিং সংরক্ষিত রয়েছে বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। যা প্রতিবেদকের কাছেও সংরক্ষিত আছে।
মামুনের হয়ে টাকার চুক্তি করতো ছাত্রদল নেতা বাবুল: সাতক্ষীরার দেবহাটার সমালোচিত যুবক আব্দুল্লাহ আল মামুনের হয়ে বিভিন্ন স্থানে চুক্তি ও টাকা সংগ্রহ করতেন ছাত্রদল নেতা জিসান বাবুল। বিগত ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর মামুনের সহযোগী হিসাবে বিভিন্ন স্থানে দেখা যায় বাবুলকে। সে সখিপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি ও মাঝ সখিপুর গ্রামের মৃত দাউদ গাজীর ছেলে।
সাম্প্রতিক সময়ে এক জনপ্রতিনিধির পারিবারিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে প্রথমে তাকে ভয়ভীতি প্রদর্শণ করা হয়। পরে দফা দফায় বিষয়টি সমাধানের জন্য দাবি করা হয় মোটা অংকের টাকা।
প্রথম অডিওতে জিসান বাবুলকে বলতে শোনা যায়, “ভাই, কী লাইন? আপডেট জানালেন না। সে (মামুন) এক কথায় রাজি না। সে বলেছে, আমি এসব ছোটখাটো কাজ করি না। ভালো করে খায়, না হলে খায় না ভাই। না হলে থাক, সমস্যা নেই।”
এরপর ভুক্তভোগীকে উদ্দেশ করে বাবুল বলেন, “ভাই, সে এক কথায় এক লাখ টাকা চাচ্ছে। এবার কী বলব বলেন? সে তো ৫০ হাজার টাকার কথাও শুনবে না।”
দ্বিতীয় অডিওতে বাবুলকে বলতে শোনা যায়, “আমি বললাম, ভাই, জিনিসটা বেশি বাড়াবাড়ি করেন না, জিনিসটা ডিলিট করে দেন। হ্যাঁ বলার পর সে বলল, সব সমাধান হোক, আমি ডিলিট করে দিচ্ছি। সমস্যা নেই। আপনি যে অ্যামাউন্ট চাচ্ছেন, সেই অ্যামাউন্টে আপনার সঙ্গে ডিল ফাইনাল করতে হবে।”
ভুক্তভোগীকে উদ্দেশ করে বাবুল আরও বলেন, “ভাই, আপনি তো জানেন, ভুক্তভোগী আপনার আত্মীয় হওয়ায় শুধু আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে সেগুলো ছাড় দিয়েছি।”
একই অডিওতে বাবুলকে আরও বলতে শোনা যায়, “শুধু একটা স্টোরি দিয়েছি। ভাই, ৩০ হাজার টাকা দেবেন, থেমে যান ভাই। নিজেদের মধ্যে এটা করেন না।”
এ সময় তিনি আরও বলেন, “সে বলছে, ওকে ৩০ হাজার টাকা দেওয়ার দরকার নেই। আমার তো বাণিজ্য করার দরকার নেই, আমার ভিউর দরকার। আপনার আত্মীয়কে বলবেন, দেখা করবেন, কথা বলবেন। ব্যস্ততার কারণে আমি সময় দিতে পারিনি। আপনি ৫০ হাজার টাকা দেন, আমি হাত-পা ধরে হলেও আপনার ভিডিওর বিষয়টি মিটমাট করে নেব।”
বিষয়টি নিয়ে সাবেক চেয়ারম্যান সাহেব আলী বলেন, আমার সাবেক স্ত্রীর সঙ্গে ধারণ করা ব্যক্তিগত ও আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করে আসছিল। এক পযয়ে আমাকে ভয় দেখিয়ে প্রথমে ৫ লাখ, পরে ৩ লাখ। এরপর ১ লাখ টাকার দাবি করে। পরবর্তীতে ৫০ হাজার টাকায় রাজি হয়। টাকা নেওয়ার পরও সে ব্লাকমেইল করতে থাকে। একই সাথে সে বিষয়টি নিয়ে আপত্তিকর ভিডিও বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করতে থাকে। পরে আমি নিরুপায় হয়ে সাতক্ষীরা সদর থানায় পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২ আইনে মামলা দায়ের করি।
সাতক্ষীরা সদর থানার ওসি তদন্ত জামিল কবির বলেন, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনের সাতক্ষীরা সদর থানায় দায়ের করা মামলার আসামী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায় সহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।