আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাম্প্রতিক যৌথ হামলায় হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন প্রকৃত সংখ্যা হয়তো কখনোই জানা যাবে না। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরাইলি হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে বহু মানুষের প্রাণহানির পর যুদ্ধ বন্ধের প্রাথমিক চুক্তিটি সম্পন্ন হলো। দেশগুলোর সরকারি হতাহতের প্রতিবেদন অনুসারে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান ও লেবাননে ৭ হাজার ৩০০ এরও বেশি মানুষ মারা গেছেন, যাদের মধ্যে রয়েছে শত শত শিশু এবং কয়েক ডজন স্বাস্থ্যকর্মী। এর বাইরেও বৃহত্তর অঞ্চল জুড়ে আরো বহু মানুষ মারা গেছেন এ যুদ্ধে।
তবে, কিছু বিশ্লেষক বলছেন, এই সংখ্যা প্রায় নিশ্চিতভাবেই প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে কম। বিশেষজ্ঞরা বিবিসিকে বলেছেন ইন্টারনেট, গণমাধ্যম এবং সরকারি বিধিনিষেধ, এমনকি কিছু এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতির কারণে তথ্য প্রদানে বাধা সৃষ্টি করেছে, যা সত্যিকার অর্থে পরিসংখ্যানের নির্ভরযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক দাতব্য সংস্থা ‘অ্যাকশন অন আর্মড ভায়োলেন্স’-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইয়ান ওভারটন বলেছেন, একাধিক দেশে এই সংঘাত চলার কারণে হতাহতের পরিসংখ্যান ‘প্রায়শই অসম্পূর্ণ, বিলম্বিত বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা অসম্ভব’।
তিনি আরও বলেন, সংঘাত শেষ হওয়ার পরেও ‘চূড়ান্ত মৃতের সংখ্যা নিয়ে সম্ভবত বহু বছর ধরে বিতর্ক থেকে যাবে’।
ইরান সরকারের আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত মার্কিন ও ইসরাইলি হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে ৪৯৯ জন নারীসহ অন্তত ৩ হাজার ৪৬৮ জন ইরানি নিহত হয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা গত ২৬ এপ্রিল জানিয়েছে, এর মধ্যে ১ হাজার ৪৬০ জন বেসামরিক নাগরিক এবং ২ হাজার ৮ জন সামরিক কর্মী রয়েছেন। কিন্তু আমেরিকা-ভিত্তিক মানবাধিকার কর্মী সংবাদ সংস্থা (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে তাদের গণনায় এই সংখ্যা ৩ হাজার ৬৩৬ জন।
গত ১৮ মে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এইচআরএএনএ জানায়, তাদের গণনায় ৩০৭ জন শিশুসহ ১ হাজার ৭০১ জন বেসামরিক নাগরিক, ১ হাজার ২২১ জন সামরিক কর্মী এবং ৭১৪ জন এমন ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত যাদের পরিচয় বা অবস্থা নিশ্চিত করা যায়নি।
সংস্থাটি আরও বলেছে, তাদের নথিভুক্ত পরিসংখ্যানকে সর্বনিম্ন হিসেবে দেখা উচিত। কারণ বিভিন্ন সাইটে প্রবেশে অসুবিধা, সরকার-আরোপিত ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এবং রাজনৈতিক দমনপীড়নের কারণে মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে হিজবুল্লাহ ইসরাইলে রকেট হামলা চালালে গত ২ মার্চ ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘাত পুনরায় শুরু হয়। এর জবাবে ইসরাইল বিমান হামলা এবং দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান চালায়। এরপর থেকে লেবাননের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে ইসরাইলি হামলায় ৩ হাজার ৯১২ জন নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ৩৬৬ জন নারী ও ২৪৭ জন শিশু।
যদিও হিজবুল্লাহ তাদের নিজস্ব পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত মাসে বলেছিলেন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ৩ হাজার হিজবুল্লাহ যোদ্ধা নিহত হয়েছেন।
এদিকে, জাতিসংঘ জানিয়েছে, লেবাননে তাদের সাতজন শান্তিরক্ষীও নিহত হয়েছেন, যার সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটে ৪ জুন। ব্যাপক বেসামরিক হতাহতের জন্য ইসরাইলি আগ্রাসন উল্লেখযোগ্য সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
গত মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আইডিএফ’র আচরণের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, এই হামলায় ‘অনেক বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন’।
প্যারিসে জি৭ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘কাউকে খোঁজার জন্য প্রতিবার একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ভেঙে ফেলার প্রয়োজন নেই। কারণ ওই অ্যাপার্টমেন্ট ভবনগুলোতে অনেক মানুষ থাকে এবং তারা সবাই হিজবুল্লাহর সদস্য নয়।’
অন্যদিকে, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক যুদ্ধে তাদের ৬০ জন সেনা নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই ইরানের হামলা এবং হিজবুল্লাহর সঙ্গে লড়াইয়ে মারা গেছেন।
এ ছাড়া আরো অনেক হামলায় হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা পাওয়া যায়নি। সুতরাং এটা নিশ্চিত করে বলা যায়, এই যুদ্ধে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা কখনোই জানা সম্ভব নয়।
সম্পাদক : রেহেনা মেহেদী
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। Dainik Aporadh Barta