
অনলাইন ডেস্ক: কয়েকশ প্রজাতির প্রাণের স্পন্দন সুন্দরবন কেবল বাংলাদেশের মানচিত্রকেই রক্ষা করে না, আগলে রাখে উপকূলের কোটি মানুষের প্রাণ। অথচ আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি, যখন সারা দেশ উৎসবে মত্ত, তখন আমাদের এই পরম বন্ধু বনটি নীরবে লড়ছে টিকে থাকার লড়াইয়ে। ২০০১ সাল থেকে সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় অঞ্চলে সুন্দরবন দিবস পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু দীর্ঘ আড়াই দশকেও এই দিনটি ক্যালেন্ডারের পাতায় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি। সাতক্ষীরার একদল তরুণ দীর্ঘ বছর ধরে এই স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের দাবি, সুন্দরবনকে অবহেলা করার অর্থ হলো নিজের ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করা। বনের ওপর নির্ভরশীল বনজীবী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের কণ্ঠেও এখন ঝরে পড়ছে হাহাকার।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলনকারীদের স্থানীয় তরুণ সংগঠক হাফিজুর রহমান হাফিজ বলেন, আমরা যারা এই বনের জন্য লড়ছি, আমরা চাই নতুন যে সরকার গঠিত হচ্ছে সেই সরকার ১৪ ফেব্রুয়ারিকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করুক। এটা আমাদের সাতক্ষীরার মানুষের প্রাণের দাবি। সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, এটি আমাদের বেঁচে থাকার ঢাল। দীর্ঘদিন ধরে আমরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছি, মানববন্ধন করছি, স্মারকলিপি দিচ্ছি কিন্তু এখনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মিলেনি।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। সুন্দরবনে ৫২৮ প্রজাতির উদ্ভিদ ও ৫০৫ প্রজাতির বন্য প্রাণীর বাস। এর মধ্যে রয়েছে ৪৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৮৭ প্রজাতির সরীসৃপ ও ১৪ প্রজাতির উভচর প্রাণী। এ ছাড়া রয়েছে ৩৫৫ প্রজাতির পাখি। ২০২৩ সালের শুমারি অনুযায়ী, সুন্দরবনে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৪টি চিত্রা হরিণ, ১ লাখ ৫২ হাজার ৪৪৪ বানর, ৪৭ হাজার ৫১৫ বন্য শূকর, ২৫ হাজার ১২৪ গুইসাপ এবং ১২ হাজার ২৪১ শজারু রয়েছে। এ ছাড়া ২০২৪ সালে সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, সুন্দরবনে বাঘ রয়েছে ১২৫টি।
একই দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় তরুণী ও শিক্ষার্থী আনিসা জামান মনির। তিনি বলেন, ‘আমরা নতুন প্রজন্ম চাই সুন্দরবন নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতা আরও বাড়ুক। সুন্দরবন দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পেলে এর গুরুত্ব আরো বেড়ে যাবে। আমরা চাই না ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বইয়ের পাতায় সুন্দরবনের গল্প পড়ুক, আমরা চাই তারা জীবন্ত সুন্দরবন দেখুক।’
বনের এই করুণ দশা আর আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবেশ আন্দোলনের নেতৃবৃন্দও। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মাধব চন্দ্র দত্ত বলেন, সুন্দরবন আজ আক্ষরিক অর্থেই অস্তিত্ব সংকটে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বনের ভেতরের লবণাক্ততা বাড়ছে, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। আমরা বছরের পর বছর দাবি জানিয়ে আসছি সুন্দরবন দিবসকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে। এতে বনের প্রতি মানুষের ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা বাড়বে। নতুন সরকারের কাছে আমাদের জোরালো দাবি, অবিলম্বে সুন্দরবন রক্ষায় আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন করা হোক এবং এই বনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হোক।
পশ্চিম বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. ফজলুল হক বলেন, ‘সুন্দরবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ সমগ্র দেশের পরিবেশ-প্রতিবেশ। তাই যেকোনো মূল্যে আমাদের প্রাকৃতিক এই সুরক্ষাদেয়ালকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। সেই সঙ্গে সুন্দরবনের ক্ষতি হয় এমন যেকোনো কর্মকা- থেকে দূরে থাকতে হবে। বন অপরাধ দমনে বন বিভাগ আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে শুধু পাহারা দিয়ে বনের সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব নয় এ জন্য প্রয়োজন ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা।