
নিজস্ব প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী গুড় পুকুরের মেলা থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৩ লাখ টাকা আদায়ে তথ্য সামনে আসায় হৈচৈ পরে গেছে। শুরু কিভাবে এত টাকা আদায় করা হয়। মেলায় ছোট-বড় প্রায় ৪৩০টি স্টল থেকে দৈনিক ২ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এর বাইরে তাঁবু, ডেকোরেশন, ইট, বিদ্যুৎ, দৈনিক জায়গার ভাড়া ও শৌচাগার ব্যবহারের নামে আলাদা অর্থ নেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো স্টলের ক্ষেত্রে জামানতের অংকও অনেক বেশী। যা দশ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে মেলার অর্থ আদায়ের স্বচ্ছতা, রসিদ প্রদান, ব্যয়ের হিসাব এবং ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে এক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন নির্বিকার থাকায় স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অন্যদিকে, অর্থ দিয়েও প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ও ব্যবসার পরিবেশ না পাওয়ার অভিযোগ করছেন মেলায় অংশ নেওয়া ক্ষুদ্র ও নারী উদ্যোক্তারা। অনুমোদনহীন বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহারের অভিযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সড়কে জনদুর্ভোগ এবং শৌচাগার ব্যবহারে অতিরিক্ত ফি আদায়ের বিষয়টিও সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রতিকারের দাবিতে ১১ অক্টোবর সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন জুঁই হানি ফার্মের স্বত্বাধিকারী নারী উদ্যোক্তা নাহিদা আক্তার। এসব অভিযোগের পর মেলার অর্থ আদায় ও ব্যবস্থাপনা তদারকিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছে- সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে সাতক্ষীরা শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে ২০ দিনব্যাপী গুড় পুকুরের মেলা শুরু হয়েছে। মেলায় ছোট-বড় প্রায় ৪৩০টি স্টল রয়েছে। এসব স্টল থেকে দৈনিক ২ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। এই হিসাবের সর্বনিম্ন অঙ্ক ধরলেও প্রতিদিন আদায় দাঁড়ায় ৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা। আর প্রতিটি স্টল থেকে গড়ে ৩ হাজার টাকা আদায় হলে দৈনিক অঙ্ক দাঁড়ায় ১২ লাখ ৯০ হাজার টাকা। সর্বোচ্চ ৪ হাজার টাকা হারে আদায় হলে তা ১৭ লাখ ২০ হাজার টাকা।
অর্থাৎ, স্টলপ্রতি গড়ে ৩ হাজার টাকা আদায়ের হিসাব সত্য হলে ২০ দিনের মেলায় শুধু দৈনিক চাঁদা বা ভাড়া বাবদ মোট আদায় দাঁড়াতে পারে ২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। ৩০ দিনের হিসাবে তা ৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। তবে মেলাটি ২০ দিনব্যাপী হওয়ায় ৩০ দিনের অঙ্কটি সম্ভাব্য হিসাবমাত্র, প্রকৃত আদায়ের পরিমাণ নয়। এর বাইরে জামানত বাবদ প্রায় এক কোটি টাকা আদায়ের কথা জানা গেছে। এই অর্থ কারা সংগ্রহ করছেন, কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে আদায় করা হচ্ছে, টাকা জমা রাখার নির্ধারিত হিসাব রয়েছে কি না এবং মেলা শেষে তা ফেরত দেওয়ার শর্ত কী- এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর জানা নেই কারো।
মেলার অর্থ আদায় ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন জুঁই হানি ফার্মের স্বত্বাধিকারী নাহিদা আক্তার। রবিবার (১১ অক্টোবর) সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া আবেদনে তিনি নিজের স্টলের জন্য বিভিন্ন খাতে অর্থ দেওয়ার বিবরণ তুলে ধরেছেন।
আবেদনে উল্লেখ করা হিসাব অনুযায়ী, তাঁবুর জন্য ৭ হাজার টাকা, ডেকোরেশনের জন্য ৯ হাজার টাকা, ইট বাবদ ৫ হাজার টাকা, দৈনিক চাঁদা হিসেবে ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং তিনটি লাইটের জন্য ৩০০ টাকা দিতে হচ্ছে। এ ছাড়া শৌচাগার ব্যবহারে প্রতিবার ১০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য স্টল প্রস্তুত করতেই এসব খাতে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এরপর প্রতিদিনের নির্ধারিত টাকা এবং অন্যান্য খরচ বহন করতে গিয়ে ব্যবসার লাভের বড় অংশ ব্যয়ে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজস্ব পুঁজি ও শ্রম দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে গিয়ে প্রয়োজনীয় সেবা না পাওয়ার বিষয়টিও তাঁর অভিযোগে উঠে এসেছে।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আচার-চাটনির দোকানদার আব্দুস সামাদ। তিনি বলেন, তাঁবুর জন্য ২০ হাজার টাকা এবং ডেকোরেশনের জন্য ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। এ অর্থের মোট ৩০ হাজার টাকাকে তিনি অফেরতযোগ্য জামানত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া দৈনিক ৪ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে বলে জানান তিনি। এর মধ্যে পাঁচটি লাইটের জন্য প্রতিদিন ৫০০ টাকা দিতে হয় বলেও তিনি জানিয়েছেন।
একটি স্টল চালু রাখতে প্রাথমিক ব্যয়, জামানত এবং প্রতিদিনের অর্থ পরিশোধের এই চাপ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য কতটা যৌক্তিক, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে জামানত যদি ফেরতযোগ্য না হয়, তবে সেটি কোন শর্তে নেওয়া হচ্ছে এবং মেলার আয়োজক কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত নীতিমালায় এর ভিত্তি কী-তা প্রকাশ করা দরকার।
মেলার ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য আলাদা টাকা নেওয়া হলেও সকাল ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। দিনের বড় একটি অংশ ও রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বন্ধ থাকায় পণ্য সংরক্ষণ এবং বিক্রয় কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, মেলার দোকানগুলোতে অনুমোদন ছাড়াই বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের এ অভিযোগ সত্য হলে তা বিদ্যুৎ নিরাপত্তা ও জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অস্থায়ী দোকানে বৈদ্যুতিক তার, সংযোগ, অতিরিক্ত লোড এবং অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই করা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ সংযোগের অনুমোদন, দায়িত্বপ্রাপ্ত সরবরাহকারী, মিটার বা বিলের হিসাব এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করা হলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হতে পারে।
মেলায় শৌচাগার ব্যবহারের জন্য প্রতিবার ১০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ী ও দর্শনার্থীর যাতায়াতের মধ্যে এই অর্থ আদায় কতটা নিয়মসম্মত, শৌচাগার পরিচালনার দায়িত্ব কার এবং ফি নির্ধারণের অনুমোদন রয়েছে কি না- তা যাচাই করা প্রয়োজন।
শৌচাগার ব্যবহারের জন্য অর্থ নেওয়া হলেই তা অনিয়ম প্রমাণিত হয় না। তবে নির্ধারিত ফি, দৃশ্যমান মূল্যতালিকা, পরিচ্ছন্নতা, সেবার মান এবং আদায়ের রসিদ নিশ্চিত করা না হলে জনস্বার্থে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
মেলার কারণে পৌর এলাকার নবারুণ স্কুল, সরকারি মহিলা কলেজ ও বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী,মেলার কারণে পৌর এলাকার নবারুণ স্কুল, সরকারি মহিলা কলেজ ও বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, পথচারী এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের নিয়মিত চলাচলে দুর্ভোগের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু থাকা অবস্থায় মেলা বসায় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
এই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতির নথি, সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও অভিভাবকদের বক্তব্য, যান চলাচলের পরিস্থিতি এবং মেলা পরিচালনার অনুমোদিত নকশা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। মেলার ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব থাকলেও তার কারণে শিক্ষা কার্যক্রম, জনসাধারণের চলাচল এবং স্থানীয় ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
গুড় পুকুরের মেলা সাতক্ষীরার ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু ঐতিহ্যের আড়ালে অর্থ আদায়, সেবা প্রদান এবং ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি অস্পষ্ট থাকলে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা পড়ার পর বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ।
গুড় পুকুরের মেলা শুধু কেনাবেচার স্থান নয়; এটি সাতক্ষীরার ঐতিহ্য, জনসমাগম ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত। তাই এই মেলার ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কাউকে দায়ী করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি লিখিত অভিযোগ ও অর্থ আদায়ের হিসাব সামনে আসার পরও বিষয়টি উপেক্ষা করাও সমীচীন নয়।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত স্টলভিত্তিক বরাদ্দ, সব ধরনের ফি ও জামানতের তালিকা প্রকাশ করা; আদায়ের রসিদ ও হিসাব যাচাই করা; বিদ্যুৎ সংযোগের বৈধতা ও নিরাপত্তা পরীক্ষা করা; এবং ব্যবসায়ী, নারী উদ্যোক্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ শুনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
ঐতিহ্যবাহী গুড় পুকুরের মেলা যেন অনিয়মের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সে জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা, নির্ধারিত ফি, নিরাপদ বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযোগগুলোর তদন্ত করে প্রকৃত চিত্র জনসমক্ষে তুলে ধরে কি না।