
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকে ৩০টির বেশি স্থানে দলের নেতা-কর্মীদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও পঞ্চগড়-১ আসনে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের পরাজিত প্রার্থী সারজিস আলম। তাঁর দাবি, এসব ঘটনার পেছনে বিএনপির নেতা-কর্মীরা জড়িত।
এসব অভিযোগ তুলে নিজের ফেসবুক পেজে কয়েকটি পোস্ট দেন সারজিস আলম। যাঁরা অতি উৎসাহী হয়ে এসব কাজ করছেন, তাঁদের সংশোধিত হওয়ার এবং অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। সারজিস আলমের এসব পোস্টের সূত্র ধরে এবং তাঁর সঙ্গে কথা বলে জেলার সদর, তেঁতুলিয়া ও আটোয়ারী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচন–পরবর্তী সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনার খোঁজ নেন এই প্রতিবেদক।
আমাদের বাইরের দরজা আর জানালায় ধাক্কা দেওয়ার প্রতিবাদ করলে প্রতিবেশী দাদা নুর আলম ওরফে সলিম উদ্দিন আমার গায়ে হাত দিয়ে একটা বাড়ি দেন। এখনো হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
ভোটের পর হামলার শিকার হওয়ার দাবি করেন তেঁতুলিয়া উপজেলার তিরনইহাট ইউনিয়নের ডাঙ্গাপাড়া এলাকায় স্বপন রানা নামের এক ইজিবাইকচালক। তাঁর পরিবারের লোকজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার ভোট গণনা ও ফলাফলের সময় ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের মধ্যে প্রথমে সারজিস আলমের শাপলা কলি প্রতীকের কর্মী–সমর্থকেরা মিছিল করেন। পরে বিএনপি প্রার্থী নওশাদ জমিরের ধানের শীষ প্রতীকের কর্মী–সমর্থকেরা মিছিল করেন। এ সময় শাপলা কলি প্রতীকের কর্মী স্বপন রানার বাড়ির বাইরের টিনের বেড়ার মূল দরজায় এবং ঘরের জানালায় কেউ কেউ ধাক্কা দেন। এর প্রতিবাদ করেন স্বপন রানার স্ত্রী পারভীন আক্তার ও মেয়ে এনসিপির নারী শক্তির তিরনইহাট ইউনিয়নের সদস্য সুচনা আক্তার। এতে দুই পক্ষের মধ্যে ঝগড়া বাধে। দুই পক্ষই একই এলাকার বাসিন্দা এবং একই বংশের।
স্বপন রানার দাবি, তিনি শাপলা কলি প্রতীকের মাইকিং করেছিলেন এবং তাঁর মেয়ে নারী শক্তির সদস্য হওয়ায় তাঁদের ওপর হামলা হয়েছে। সুচনা আক্তার বলেন, ‘আমাদের বাইরের দরজা আর জানালায় ধাক্কা দেওয়ার প্রতিবাদ করলে প্রতিবেশী দাদা নুর আলম ওরফে সলিম উদ্দিন আমার গায়ে হাত দিয়ে একটা বাড়ি দেন। এখনো হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’
এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা আরজিনা আক্তার বলেন, ‘ভোটের দিন রাতে আমরা বাড়ির বাইরের সড়কে ধানের শীষের মিছিল করছিলাম, অপর দিকে কয়েকজন শাপলা কলির মিছিল করছিল। আমাদের মিছিলটা যখন স্বপন রানাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, তখন আমার চাচাশ্বশুর সলিম উদ্দিন ওদের জানালার পাশে পড়ে গিয়ে শব্দ হয়। এ সময় স্বপনের স্ত্রী ও মেয়ে বের হয়ে চিল্লাচিল্লি শুরু করেন। এ সময় আমাদের সঙ্গে তাঁদের ঝগড়া লাগে। এ সময় স্বপনের মেয়ে ভিডিও করতে করতে বলছিল, “দেখেন দেখেন, বিএনপির লোক আমাদের ওপর কীভাবে হামলা করছে।” আসলে এখানে হামলার কোনো ঘটনাই ঘটেনি।’
বিএনপি প্রার্থীর লোকজন থেকে হুমকি পেলেও মারধরের শিকার হননি বলে জানালেন পঞ্চগড় সদর উপজেলা ধাক্কামারা ইউনিয়নের মীরগড় বাজারে পান ও মুদিদোকানদার মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমি শাপলা কলি প্রতীকের নির্বাচন করেছিলাম। এ জন্য ভোটের পরদিন স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতা আমাকে দোকান বন্ধ রাখতে বলে। তারপরও আমি আমার ছেলেকে দিয়ে দোকান খোলা রাখি। আমি দোকানে আসার পর একজন বিএনপি নেতা আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে আসে। এ সময় তাদেরই কয়েকজন তাতে বাধা দিছে। পরে তাদের কয়েকজন এসে আবার আমাকে দোকান খোলা রাখতে বলেছে। আমাকে কেউ মারধর করেনি।’
এ ঘটনার বিষয়ে ধাক্কামারা ইউনিয়ন বিএনপির ২ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি বদরুজ্জামান বলেন, এখানে মারধর বা কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি। মিজানুর রহমান নামের ওই দোকানদার ভোটের দিন বিএনপির কয়েকজন কর্মীকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছিলেন। বদরুজ্জামান বলেন, ‘মিজানুরের ওপর বেশ কয়েকজন খ্যাপা ছিলেন। এ জন্য আমি অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে তাকে ভোটের পরের দিন দোকানটা বন্ধ রাখতে বলেছিলাম। পরে খুলতে বলেছিলাম। ওখানে কেউ হামলা করেনি। সে–ও তো আমাদের এলাকার ছেলে। তার বড় ভাই আমাদের সঙ্গে বিএনপি করে।’
ফেসবুকে সারজিস আলম যে দাবি করেছেন, তার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন বদরুজ্জামান।
জেলার আটোয়ারী উপজেলার গুঞ্জরমারী এলাকায় গিয়ে কথা হয় এনসিপির সমর্থক সাইফুল ইসলামের সঙ্গে। তাঁর বাড়িতে হামলার খবর পেয়ে দেখতে এসেছিলেন সারজিস আলম। তিনি জানান, ভোটের দিন রাত প্রায় ১১টার দিকে বাড়িতে কোনো কিছু পুড়ে যাওয়ার গন্ধ পাচ্ছিলেন। পরে বাড়ির পশ্চিম পাশে গিয়ে দেখেন, খড়ির ঘরে আগুন জ্বলছে। কেউ হয়তো আগুন লাগিয়ে দিয়ে চলে গেছে। পরে আগুন নিভিয়ে ফেলা হয়।
সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এরপর শুক্রবার রাত আটটার দিকে বিএনপির সমর্থক একদল লোক মিছিল নিয়ে রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে আমার বাড়ি বাইরের উঠানে এসে নাচানাচি করেছে। কেউ কেউ বাইরের বেড়ার টিনে বাড়ি দিয়েছে। এ সময় আমি বাড়িতে ছিলাম না। আমার বাড়ির বাইরের উঠানে এনসিপি দুইটা উঠান বৈঠক করেছিল, এ জন্য কয়েকজন ছেলে নাকি চিৎকার করে বলছিল—এনসিপির সাইফুল কই। পরে আমি বাড়িতে ফিরলে একজন বিএনপি কর্মী আমার গলা টিপে ধরে। পরে রাতে আমার বাড়িতে সারজিস আলম দেখতে এসেছিলেন।’
আটোয়ারী উপজেলার রানীগঞ্জ বাজারে একটা চৌকিতে বসে মাছের দোকান চালাতেন আবদুল ওহাব। তিনি শাপলা কলি প্রতীকের সমর্থক। বৃহস্পতিবার রাতের আঁধারে কে বা কারা তাঁর দোকানের চৌকিটি উল্টে দেয় এবং খুঁটি ভেঙে দেয়। তিনি ভাঙা চৌকিতে বসে এখন দোকান চালাচ্ছেন। তাঁর পাশেই ওপরে পলিথিন টেনে পিঠার দোকান চালাতেন আবদুল কাদের নামে একজন জামায়াত কর্মী। একই রাতে কারা যেন তাঁর দোকানের চুলাসহ সবকিছু ভেঙে দিয়ে গেছে।
এ বিষয়ে আটোয়ারী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম (দুলাল) বলেন, সাইফুল ইসলাম নামের ওই ব্যক্তির বাড়ির বাইরে একটা গোয়ালঘরে আগুন লেগেছিল কয়েক দিন আগে। সাইফুলের বাড়ির বাইরে ছেলেপেলে মিছিল নাচানাচি করেছে, কিন্তু কারও ওপর হামলা করেনি।
নজরুল ইসলামের দাবি, আটোয়ারীতে এনসিপির কোনো নেতা-কর্মীর ওপর, তাঁদের বাড়িঘরে ও দোকানে হামলার ঘটনা ঘটেনি। দুইটা ছয়-সাত বছরের বাচ্চার ঝগড়াকে বড় করে ফেসবুকে প্রচার করা হচ্ছে। বরং এনসিপির লোকজনের হামলায় আহত হয়ে আবদুর রহিম নামের স্বেচ্ছাসেবক দলের একজন নেতা হাসপাতালে ভর্তি আছেন। বিএনপির নামে এসব অপপ্রচার ছড়ানো হচ্ছে।
পঞ্চগড়ের পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন এলাকা থেকে ছোট ছোট ঘটনার খবর পেয়ে সেখানে পুলিশ পাঠানো হচ্ছে। বড় ধরনের কোনো ঘটনা পাওয়া যায়নি। এগুলো বেশির ভাগই গ্রামের ভিন্ন ভিন্ন প্রতীকের সমর্থকদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটির মতো। এসব ঘটনার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগও পাওয়া যায়নি।
এনসিপির বিভিন্ন নেতা-কর্মী ও তাঁদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের হামলার হিসাব তুলে ধরে সারজিস আলম মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখনো আমাদের কর্মীদের ওপর হামলা হচ্ছে। এখনো কারও দোকান বন্ধ রাখা, দেখে নেওয়াসহ নানা প্রকার হুমকি অব্যাহত আছে। কেউ কেউ ভয়ে বাড়ির বাইরে অন্য জায়গায় গিয়ে আছে। এ বিষয়ে আমরা রাজনৈতিকভাবে বিএনপির বিজয়ী প্রার্থী নওশাদ জমির ভাইয়ের সঙ্গে এবং প্রশাসনের সঙ্গে বলেছি যে তাঁদের লোকজন বিজয়ের এই মুহূর্তকে নানাভাবে প্রকাশ করবে। তবে সেটা যেন কারও ওপর আক্রমণাত্মক না হয়। এসব বলার পরও যদি কাজ না হয়, তাহলে হয়তো আইনগত প্রক্রিয়ায় যেতে হবে।’
এ বিষয়ে আসনটিতে বিএনপির বিজয়ী প্রার্থী নওশাদ জমিরের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। কথা হয় তাঁর নির্বাচনী এজেন্ট ও ছোটভাই নওফল আরশাদ জমিরের সঙ্গে।
সারজিস আলমের প্রতি পাল্টা অভিযোগ তুলে নওফল আরশাদ মুঠোফোনেপ্রথম আলোকে বলেন, শুক্রবার সারজিস আলমের লোকজন আটোয়ারীতে সংখ্যালঘু লোকজনের বাড়িঘরে হামলার মতো একটা অবস্থা সৃষ্টি করেছিল। এমনকি ধাক্কাধাক্কি পর্যন্ত করেছে যে ওইসব লোকজন ধানের শীষের পক্ষে কাজ করেছেন। এছাড়া বিএনপির রিপন ও মাসুম নামে দুজন কর্মীকে আহত করা হয়েছে। তাঁরা একের পর এক অপবাদ দিয়ে যাচ্ছে, একের পর এক নিউজ বানিয়ে যাচ্ছে, এগুলার কোনো সত্যতা নেই।
নওফল আরশাদ আরও বলেন, ‘আমাদের নেতা–কর্মীদের স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, ১৭ বছরের যে প্রতিহিংসার রাজনীতি সেই রাজনীতি থেকে বের হয়ে এসে আমরা নতুন বাংলাদেশ গড়ার রাজনীতিতে প্রবেশ করছি এই নির্বাচনের মাধ্যমে। কাজেই এখানে কোনোরকম সুযোগ নাই প্রতিহিংসার রাজনীতি করার, প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমন-পীড়নের। এরকম কাজ যদি কেউ করে, শুধু তা-ই না কেউ যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করার চেষ্টা করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পতাকার আন্ডারে থেকে, তাহলে তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হবে। শুধু তা-ইনা, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’