
নিজস্ব প্রতিনিধি: উচ্চ সুদের প্রলোভনে পড়ে সর্বস্ব হারানোর অভিযোগ উঠেছে সুদখোর মিজানুর রহমান ওরফে সুদি মিজান নামের এক দলিল লেখকের বিরুদ্ধে। মাথায় টুপি ও মূখ ভর্তি দাড়ি রেখে লেবাসধারী এ সুদখোর নিজেকে জামায়াত নেতা হিসেবে পরিচয় দেন ও সাতক্ষীরা সদর দলিল লেখক সমিতির সহ-সভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন। সুদখোর মিজানুর রহমান ওরফে সুদি মিজান কালিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা হলেও তিনি সাতক্ষীরা শহরের মুনজিতপুর এলাকায় ভাড়া বাড়িতে বসবাস করেন।
সাতক্ষীরা রেজিষ্ট্রি অফিসের দলিল লেখক হওয়ার সুবাদে সুদি মিজান তার সুদেও ব্যবসা রমরমা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে সুদখোর মিজানুর রহমান ওরফে সুদি মিজান সুদের ব্যবসার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলে তাদের আর্থিকভাবে নিঃস্ব করে দিচ্ছে। এমনকি সুদেও ফাঁদে ফেলে তাদেও জমি জায়গা তার ও তার চক্রের সদস্যদেও নামে পাওয়ারনামা দলিল করে সর্বশান্ত করছে এই সুদি মিজান। ইতোমধ্যে একাধিক পরিবার তার কারণে সব কিছু হারিয়ে সর্বশান্ত হয়ে গেছে। অসহায় জীবন যাপন করছেন আরো অনেকে।
ভুক্তভোগী সূত্রে জানা যায়, শুরুতে স্বল্প পরিমাণ টাকা সহজ শর্তে ধার দেন সুদি মিজান। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সুদের হার অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেন তিনি। অনেক ক্ষেত্রে মাসিক ১০ থেকে ২০ শতাংশ, অনেক সময় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধ করতে না পারলে সুদের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দেন, ফলে ঋণগ্রহীতারা এক পর্যায়ে দেনার বোঝা সামলাতে না পেরে ভিটেবাড়ি পর্যন্ত হারিয়ে ফেলছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ভুক্তভোগী জানান, ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পারলে মিজান ও তার সহযোগীরা বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করেন। বাড়িতে গিয়ে হুমকি-ধামকি দেওয়া, সামাজিকভাবে অপমান করা এমনকি সম্পত্তি লিখে নিতে বাধ্য করার অভিযোগও উঠেছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে জমি, গহনা ও অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ চেষ্টা করেছে, কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি।
এমনই একজন ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রথমে ২০ লক্ষ টাকা নিয়েছিলাম। তার জন্য ওই সুদি মিজানকে দুইটি ফাঁকা চেক, ষ্ট্যাম্প, এমনকি ভিটা বাড়ি রেজিষ্ট্রি পাওয়ারনামা কওে দিতে হয়েছে। বিনিময়ে ৮ লক্ষ টাকা সুদ দেওয়ার পরও এখনও ১২ লক্ষ টাকা দিতে হবে। নইলে আমার পিতার ভিটা হাতছাড়া হয়ে যাবে বলে হুমকি প্রদান করছে ওই সুদি মিজান। এখন আমরা পথে বসার মতো অবস্থা।”
স্থানীয়দের দাবি, মিজান তার প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসা চালিয়ে আসছেন। তার বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলে নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেকেই চুপ থাকতেই বাধ্য হচ্ছেন।
এদিকে সচেতন মহল বলছে, এমন অনিয়ন্ত্রিত সুদের কারবার গ্রামীণ অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ সহজেই এই ফাঁদে পড়ে যাচ্ছে এবং এক সময় তাদের জীবিকা, বাসস্থান ও সামাজিক অবস্থান সবকিছুই হারিয়ে ফেলছে।
তার সাথে বিভিন্ন সময় এ প্রতিনিধির কথা হলে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে সুদখোর মিজানুর রহমান ওরফে সুদি মিজান দাবি করেন, “আমি কাউকে জোর করে টাকা দেই না। সবাই নিজের ইচ্ছায় নেয় এবং চুক্তি অনুযায়ী পরিশোধ করে। তাছাড়া আমি কোন সুদ নেয় না। টাকা ব্যবসায় খাটালে তো একটা লাভ আছে। আমি সেই লাভটা নিয়ে থাকি। আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।”
এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তারা জনগণকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং অবৈধ সুদের লেনদেন থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
ভূক্তভোগীরা সাতক্ষীরা পুলিশ সুপারের হস্তক্ষেপ কামনা করে দ্রুত তদন্ত করে ওই সুদি মিজানকে আইনের আওতায় আনা হোক ও তার দলিল লেখকের লাইসেন্স বাতিল এবং ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হোক। অন্যথায় এ ধরনের সুদের ফাঁদে পড়ে আরও অনেক পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।