• আজ- রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ১১:৩২ অপরাহ্ন

যুদ্ধের শুরুতেই ইরানে গোপন হামলা চালায় আমিরাত, বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

রিপোর্টার: / ২০ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: চলমান ইরান যুদ্ধে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এক অপ্রত্যাশিত ও গোপন ভূমিকার কথা এবার সামনে এসেছে। যুদ্ধের শুরুর দিনগুলো থেকে শুরু করে গত এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরদিন পর্যন্ত আমিরাত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইরানের ওপর ডজনখানেক বিমান হামলা চালিয়েছে। খবর ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের

সম্প্রতি এই অভিযানের বিষয়ে অবগত একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানা গেছে।

নিজের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় আমিরাতের এই আগ্রাসী সামরিক ভূমিকা মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির ক্রমবর্ধমান নীতি পরিবর্তনেরই প্রমাণ। এটি উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে আমিরাতকে সম্পূর্ণ আলাদা করেছে, কারণ ওই প্রতিবেশীরা ইরান-হুমকি মোকাবিলায় বরাবরই অনেক বেশি সতর্ক ও রক্ষণশীল পথ বেছে নিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, মার্কিন ও ইসরাইলি গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তাদের সঙ্গে যৌথ সমন্বয়ে এই হামলাগুলো চালানো হয়। হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল হরমুজ প্রণালির কেশম ও আবু মুসা দ্বীপ, বন্দর আব্বাস, পারস্য উপসাগরের লাভান দ্বীপের তেল শোধনাগার এবং আসালুয়েহ পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স।

বলা হচ্ছে, আমিরাতের তেল ও গ্যাস অবকাঠামোতে তেহরানের হামলার জবাবেই ইরানের এসব জ্বালানি স্থাপনাকে নিশানা করা হয়। তবে ইসরাইলের সঙ্গে মিলে আসালুয়েহতে চালানো হামলাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ওয়াশিংটন স্বয়ং ইসরাইলকে ইরানের জ্বালানি খাতে হামলা বন্ধ করার অনুরোধ জানায়।

পালটে যাওয়া সমীকরণ ও উপসাগরীয় অঞ্চলের ফাটল

যুদ্ধ শুরুর আগে উপসাগরীয় দেশগুলো ঘোষণা দিয়েছিল যে, তারা তাদের আকাশসীমা বা সামরিক ঘাঁটি অন্য কোনো দেশের ওপর হামলার জন্য ব্যবহার করতে দেবে না। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান যখন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে উপসাগরীয় অঞ্চলের জনবসতি, জ্বালানি অবকাঠামো এবং বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে, তখন অনেকেই অবস্থান বদলাতে বাধ্য হয়।

সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয় আরব আমিরাত। ইরান তাদের লক্ষ্য করে ২,৮০০-এর বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে, যা ইসরাইলসহ অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে অনেক বেশি।

তবে ইরানের বিরুদ্ধে আমিরাতের এই কঠোর সামরিক অবস্থান উপসাগরীয় অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ বিরোধকে আরও উস্কে দিয়েছে। এপ্রিলের শুরুতে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অভিযোগ করে যে, আমিরাতের এসব হামলার কারণে পুরো অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোগুলো ইরানের পালটা হামলার মুখে পড়ছে। এর ফলে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে বিশ্ববাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। রিয়াদ চেয়েছিল, ওয়াশিংটন যেন আবুধাবিকে এই প্রতিশোধমূলক হামলা বন্ধ করতে চাপ দেয় এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় শামিল করায়।

অবশ্য আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই সন্ত্রাসী হামলা এবং এর সমস্ত পরিণতির জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাত পুরোপুরি ইরানকেই দায়ী করে। এই বিষয়ে সৌদি আরব, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা হোয়াইট হাউস কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

সৌদি আরব নিজে ইরানের কাছ থেকে তুলনামূলক কম ও কম ক্ষতিকর হামলার মুখোমুখি হওয়ায় তারা প্রকাশ্যে এই সংঘাতের নিন্দা জানালেও যুদ্ধংদেহী মনোভাব এড়িয়ে চলেছে এবং কূটনীতির মাধ্যমে সংকট সমাধানের চেষ্টা করছে।

সৌদি-আমিরাত দূরত্ব ও ইসরাইল অক্ষ

উপসাগরীয় অঞ্চলের দুই পরাশক্তি সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যকার দূরত্ব এখন আরও স্পষ্ট। যুদ্ধের শুরুর দিকে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক পদক্ষেপে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানালে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ। সুদান ও ইয়েমেন যুদ্ধ এবং লোহিত সাগরে প্রভাব বিস্তার নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আগে থেকেই যে প্রতিযোগিতা চলছিল, এই ঘটনা তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত এপ্রিলে সৌদি নেতৃত্বাধীন তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ‘ওপেক’ থেকে বের হয়ে যায় আমিরাত। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক দ্বিগুণ করার অঙ্গীকার করে।

সামরিক হামলার পাশাপাশি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদেও ইরানের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয় আমিরাত। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একাধিপত্য ভাঙতে প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের খসড়া প্রস্তাব সমর্থন করে তারা। এছাড়া দুবাইতে থাকা ইরান-সংশ্লিষ্ট স্কুল ও ক্লাব বন্ধ করে এবং ইরানি নাগরিকদের ভিসা ও ট্রানজিট সুবিধা বাতিল করে তেহরানের অর্থনৈতিক লাইফলাইন টেনে ধরেছে আবুধাবি। ইরানও পালটা জবাবে আমিরাতের বিরুদ্ধে আমেরিকা-ইসরাইল শিবিরের হয়ে কাজ করার অভিযোগ এনেছে।

অবশ্য ইরানের মতো এক বিশাল ও নিকটবর্তী প্রতিবেশীকে দমানোর মতো সামরিক সক্ষমতা আমিরাতের আছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়। কারণ আমেরিকা ও ইসরাইলের চালানো ২০,০০০-এর বেশি হামলার তুলনায় আমিরাতের এই কয়েক ডজন হামলা ছিল মূলত প্রতীকী। উলটো এই আগ্রাসী নীতির কারণে তারা ইরানের বড় লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। মে মাসের শুরুতে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে মার্কিন নৌবাহিনী অভিযান শুরু করলে, ইরান আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ ফুজাইরাহ তেল বন্দরে হামলা চালায়। সম্প্রতি ইরাকের ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের ছোঁড়া একটি ড্রোন আমিরাতের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছাকাছি এসে আঘাত হেনেছে।

তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আমিরাত কিছুটা নরম সুর দেখাচ্ছে। এই যুদ্ধ তাদের বিশাল জ্বালানি খাতকে ঝুঁকিতে ফেলায় তারা এখন কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছেন।

এদিকে, মে মাসের শুরুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে এক ফোনালাপে মধ্যপ্রাচ্যের যে নেতারা ইরানের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করার তাগিদ দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে আমিরাতের প্রেসিডেন্টও ছিলেন।

তবে এই যুদ্ধ যা-ই করুক না কেন, ইসরাইল ও আরব আমিরাতের মধ্যকার জোটকে আরও শক্তিশালী করেছে। যুদ্ধের সময় আমিরাতের ভূমিকা দেখে উচ্ছ্বসিত ইসরাইলি কর্মকর্তারা এই সম্পর্ককে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্ব হিসেবে দেখছেন। প্রতিরক্ষার জন্য আমিরাতে ‘আয়রন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সেনা পাঠিয়েছে ইসরাইল, যার বড় একটি অংশ এখনো সেখানে মোতায়েন রয়েছে। এমনকি যুদ্ধ চলাকালীন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ও শিন বেতের প্রধান এবং ইসরাইলি সেনাপ্রধান গোপনে আমিরাত সফর করে ইরান ইস্যুতে যৌথ কৌশল নির্ধারণ করেছেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অন্যান্য লেখা সমূহ