
অনলাইন ডেস্ক: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে রাজনীতি। এর প্রতিফলন ঘটছে ভোটের মাঠে। নির্বাচনী প্রচারণায় সংঘাত-সহিংসতা বাড়ছে, বাড়ছে হতাহতের ঘটনাও। সবশেষ বুধবার রাতে শেরপুরে প্রাণ হারিয়েছেন একজন জামায়াত নেতা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বুধবারের ঘটনাসহ তফসিলের পর দেশে ১৭টি রাজনৈতিক হত্যা সংঘটিত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৭ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, যা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যাপক উপস্থিতির প্রমাণ দেয়।
এদিকে প্রতিদিনের বিবাদে এ পর্যন্ত অন্তত শতাধিক আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া নির্বাচনের প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তো রয়েছেই। সব মিলিয়ে নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে রীতিমতো শঙ্কিত হয়ে উঠেছেন রাজনৈতিক ও নির্বাচন বিশ্লেষকসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। তারা নির্বাচনের সহিংসতার আবহ ফিরে আসার আশঙ্কা করছেন।
এ বিষয়ে নির্বাচন বিশ্লেষক ড. আব্দুল আলীম বলেন, বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে ভোটারদের আস্থা ফেরানো কঠিন হবে। তিনি বলেন, নিরাপত্তা নিয়ে যে শঙ্কা বা নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে সেটি কমিশনের জন্য চ্যালেঞ্জ। অবশ্য নির্বাচন সুষ্ঠু এবং সংঘাতমুক্ত রাখতে রাজনৈতিক দলগুলোকেও ভূমিকা রাখার কথা বলছেন এই বিশ্লেষক।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন একা নির্বাচন করতে পারে না, সম্ভব না। প্রার্থীরা যদি নিয়ম না মানে তখন নির্বাচন কমিশন যদি সবাইকেই মাঠ থেকে বের করে দেয়, লাল কার্ড দেখায় তাহলে তো নির্বাচনটাই হবে না। রাজনৈতিক দলের নেতাদেরকে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সংযত থাকার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের বক্তব্যে উসকানির একটা আবহ আমি পাচ্ছি, এটা পরিহার করা প্রয়োজন। এটা করতে পারলে সহিংসতা অনেকাংশে কমে আসবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন থাকবে- এ নিয়ে বেশ আগে থেকেই উদ্বেগ জানিয়ে আসছিলেন নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে, নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর কদিন আগে দুর্বৃত্তের গুলিতে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর এই শঙ্কা বাড়তি মাত্রা পেয়েছিল।
বুধবার রাতে শেরপুরে নির্বাচনী ইশতেহার অনুষ্ঠানে বিএনপির সঙ্গে সংঘর্ষে শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম নিহত হওয়ার পর নির্বাচনের আগেই ভোটের মাঠ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে কি-না এমন প্রশ্ন সামনে আসছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রচার-প্রচারণা কিংবা আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, শরীয়তপুর, সিরাজগঞ্জসহ অন্তত ১০ জেলায় বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। এসব সংঘাতের বেশিরভাগই ঘটেছে বিএনপি এবং জামায়াত-এনসিপি জোটের সমর্থকদের মধ্যে।
ঢাকায় নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে সম্প্রতি ডিম হামলার শিকার হন ঢাকা-৮ সংসদীয় আসনের জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। এই ঘটনায় প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
অন্যদিকে জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রার্থীর বিরুদ্ধে ‘উসকানিমূলক ও অশালীন’ বক্তব্য দেয়ার অভিযোগ এনেছে বিএনপি। সব মিলিয়ে এই আসনে বিএনপি এবং জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রার্থীর পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে ভোটের মাঠে উত্তেজনা রয়েছে। সামাজিক মাধ্যমেও এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা।
চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী আমবাগান এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বুধবার বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। প্রচারণার সময় সেøাগান দেয়াকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার এই ঘটনার সূত্রপাত বলে জানা গেছে। পরদিন দুই পক্ষের মধ্যে আবারও সংঘাতের ঘটনা ঘটে। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে দুই দলই।
খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম জানান, মঙ্গলবার নির্বাচনী প্রচারণার সময় মুখোমুখি হয়েছিল বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকরা। ওইদিন পুলিশের হস্তক্ষেপে উত্তেজনা না বাড়লেও পরদিন আবারও সংঘাতে জড়ায় তারা।
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়া পোস্টের জেরে সংঘর্ষে জড়িয়েছেন শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মী-সমর্থকরা।
নড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাহার মিয়া জানান, বিএনপি কর্মী গণভোটে ‘না’ এর পক্ষে প্রচারণা চালা”েছন, এমন দাবি করে জামায়াতে ইসলামীর এক নারী কর্মীর ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করেই সংঘাতে জড়াই দুই পক্ষ। এই ঘটনায় পাল্টাপাল্টি মামলা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে সিরাজগঞ্জ সদর সংসদীয় আসনে। এই ঘটনায় দুই পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।
সিরাজগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, সংঘাত যাতে আর না বাড়ে সেজন্য বিবাদমান দুই পক্ষের সঙ্গেই প্রশাসন কথা বলেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এছাড়া, নাটোর-১ লালপুর-বাগাতিপাড়া আসনে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নির্বাচনী ব্যানার পুড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ করেছেন বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা। নড়াইলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনী কার্যালয়ে আগুন দেয়ার অভিযোগ করছেন একজন প্রার্থী।
ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ২৫ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় গত রবিবার বিএনপি ও জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন আহত হন।
একই দিনে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১৩ জন আহত হয়েছেন। ময়মনসিংহে বিএনপির প্রার্থী ও দলটির বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে হামলা ও কার্যালয় ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নির্বাচনের পরিবেশ ভালো দাবি সরকারের:
বিগত বছরগুলোর চেয়ে এ বছর এখনও নির্বাচনের পরিবেশ ভালো বলে দাবি করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
বৃহস্পতিবার বিকালে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ দাবি জানিয়ে বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এখন পর্যন্ত চারজনের প্রাণহানি হয়েছে। এসব ঘটনা অনাকাক্সিক্ষত হলেও নির্বাচনের পরিবেশ বিগত সরকারের আমলের চেয়ে ভালো।
শফিকুল আলম বলেন, বিগত সরকারের আমলে হওয়া নির্বাচনগুলোর এখন পর্যন্ত নির্বাচনের পরিবেশ ভালো। ২০১৪ সালের আগে নির্বাচনে সহিংসতায় ১১৫ জন নিহত হয়েছেন। সেই হিসেব নির্বাচনী পরিবেশ ভালো। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যথেষ্ট সহিষ্ণুতা রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এ সময় শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সরকার পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানান উপ প্রেসসচিব আজাদ মজুমদার। তিনি বলেন, এই ঘটনায় জড়িতদের বিভিন্ন ফুটেজ বিশ্লেষণ করে গ্রেপ্তারের কাজ করছে পুলিশ। সেইসঙ্গে নিরপরাধ কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হয় সে বিষয়েও সরকার সতর্ক রয়েছে।
অধিকাংশ খুনই হয়েছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রে:
তফসিল ঘোষণার পর এ পর্যন্ত যারা নিহত হয়েছেন তাদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিহতদের মধ্যে বিএনপির ১২ জন। অন্যদের মধ্যে শহীদ ওসমান হাদি ছাড়া রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর দুজন এবং নিষিদ্ধ সংগঠন যুবলীগের এক নেতা। এদের ছয়জনকে গুলিতে, পাঁচজনকে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে এবং বাকিদের ছুরিকাঘাত ও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। অর্থাৎ অধিকাংশ খুনই হয়েছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রে।
শহীদ ওসমান হাদি ঢাকা-৮ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর গুলিবিদ্ধ হন তিনি। ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ৭ জানুয়ারি রাজধানীর তেজগাঁওয়ের তেজতুরী বাজার এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় বিএনপির সহযোগী সংগঠন স্বে”ছাসেবক দল ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজের রহমান ওরফে মোছাব্বিরকে। এরপর ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর এক সমর্থককে।
৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজানের পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের অলিমিয়াহাটে উপজেলা যুবদলের সদস্য মুহাম্মদ জানে আলমকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। স্থানীয় রাজনীতিতে তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান (পদ স্থগিত) গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। গিয়াস কাদের চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে বিএনপির দুই প্রার্থীর একজন। ধোবাউড়ায় মো. নজরুল ইসলাম (৪০) নামে যিনি নিহত হন, তিনি ময়মনসিংহ-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমরের কর্মী।
নির্বাচনের আর ১২ দিন বাকি থাকতে দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয় বলেই মনে করেন অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দায়িত্ব নিতে হবে। কোনো সহিংস ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নীরব না থেকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।