
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নৌ অবরোধের ফলে ইরানের প্রতিদিন প্রায় ৪৩৫ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫,৩৪৪ কোটি ২৪ লক্ষ ৯০ হাজার টাকা) অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সংবাদমাধ্যমটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার থেকে এই অবরোধ কার্যকর হয়েছে বলে ঘোষণা দেন। এর ফলে তেল, সার, খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে, যা বৈশ্বিক বাজারে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়াতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নির্ভর করবে কয়েকটি অনিশ্চিত বিষয়ের ওপর। এর মধ্যে রয়েছে—মার্কিন অবরোধ কতটা কঠোরভাবে কার্যকর হয়, ইরান কতটা বিকল্প রুট, বিশেষ করে জাস্ক টার্মিনালের মাধ্যমে তেল রপ্তানি চালিয়ে যেতে পারে।
কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শেষ দিকে ইরানের প্রায় ১৫ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল তেল অবরোধ-প্রভাবিত উপসাগরের বাইরে ভাসমান অবস্থায় ছিল, যা স্বল্পমেয়াদে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা মিয়াদ মালেকি বলেন, ‘ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধে প্রতিদিন প্রায় ৪৩৫ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে।’
এর মধ্যে প্রায় ২৭৬ মিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার কারণে ক্ষতি হবে, যা মূলত অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য থেকে আসে।
গত সপ্তাহান্তে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখার আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অবরোধের হুমকি দেন। এর আগে ইরান নিজেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত করেছিল এবং ‘বন্ধুসুলভ’ জাহাজ ছাড়া অন্যদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অবরোধের মূল লক্ষ্য হলো জ্বালানি বাণিজ্য থেকে ইরানের আয়ের প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া।
মার্কিন বিশ্লেষক মার্ক থিসেন বলেন, এই অবরোধ কার্যত খার্গ দ্বীপ দখলের মতো সামরিক অভিযানের সমান প্রভাব ফেলতে পারে—যেখানে ইরানের বেশিরভাগ তেল রপ্তানি হয়। তবে এতে স্থলবাহিনী মোতায়েনের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।
চীনের ওপরও চাপ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের জ্বালানি রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হলে চীনের ওপরও চাপ তৈরি হবে। কারণ, চীনের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৪৫–৫০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৩০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এতে বেইজিংকেও যুক্তরাষ্ট্রের চাপ প্রয়োগ কৌশলে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ
অবরোধ কার্যকর করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ১৬টি যুদ্ধজাহাজ থাকলেও পারস্য উপসাগরে সরাসরি কোনো যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন নেই।
এছাড়া, নাবিকদের জন্য জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোতে প্রবেশ সীমিত করা হবে, তবে বাস্তবে এই পদক্ষেপ কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
লন্ডনভিত্তিক রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিস ইন্সটিটিউট-এর নৌবিশেষজ্ঞ সিধার্থ কৌশল বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জাহাজ চলাচল করে, যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
তার ভাষায়, ‘শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র কতগুলো জাহাজ আটক করতে পারে এবং অন্য জাহাজগুলোকে কতটা ভয় দেখাতে পারে—তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। তবে বাস্তবে এই অবরোধ কার্যকর করা কঠিন হবে বলেই মনে হচ্ছে।’