• আজ- বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ১২:১৩ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ

পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলিমদের জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে ভারত: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

রিপোর্টার: / ২৯ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী বাঙালিদের, বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

মঙ্গলবার (১৬ জুন) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) সীমান্তে বসবাসকারী বহু মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) এসব ব্যক্তিকে যথাযথ যাচাই ছাড়া প্রবেশ করতে না দেওয়ায় অনেক পরিবার দুই দেশের সীমান্তের মধ্যবর্তী ‘জিরো লাইনে’ আটকা পড়ে যাচ্ছে।

বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে এখন পর্যন্ত বিএসএফের অন্তত ২১টি ‘পুশইন’ প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় শিশুসহ ২০০ জনেরও বেশি মানুষ বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, তার সরকারের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির আওতায় শত শত ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে’ আটক করা হয়েছে এবং প্রায় পাঁচ হাজার মানুষকে ‘ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে’।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পরিবারগুলোকে নির্মমভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে অথবা সীমান্তে আটকে রাখছে, যা তাদের মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। সরকারকে অবৈধ বহিষ্কার বন্ধ করতে হবে এবং নাগরিকত্ব যাচাইয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।’

সংস্থাটি জানায়, তারা এমন নয়জন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেছে যারা দেখেছেন, রাতের আঁধারে বিএসএফ বিভিন্ন দলকে সীমান্তে নিয়ে গিয়ে কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কয়েকটি ঘটনায় বিজিবি প্রবেশে বাধা দিলে বিএসএফ পরে তাদের ভারতেই ফিরিয়ে নেয়।

বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলায় ৫ জুন শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করলে ৭৫ ঘণ্টার অচলাবস্থা তৈরি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল হোসেন বলেন, ‘তারা প্রায় ৫০ ফুট বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। পরে বিজিবি এসে তাদের থামায়। এরপর তারা সীমান্তের মাঝামাঝি এলাকায় অবস্থান নেয়।’

তিনি জানান, প্রথম রাতে প্রবল বৃষ্টি ও বজ্রপাতের মধ্যে তারা খোলা আকাশের নিচে ছিল। দ্বিতীয় দিনে বিএসএফ কিছু শুকনো খাবার দেয়। কয়েক দফা পতাকা বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর বিএসএফ তাদের আবার ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নেয়।

৬ জুন ভোরে দুইটি বাঙালি মুসলিম পরিবারের ছয় সদস্যকে ঠাকুরগাঁও সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বিজিবি তাদের বাংলাদেশে প্রবেশে বাধা দিলে এবং বিএসএফ ভারতে ফিরতে না দিলে তারা দীর্ঘ সময় সীমান্তে আটকা পড়ে থাকে। পরে তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

এছাড়া ৮ জুন ঠাকুরগাঁওয়ের জিরো লাইনে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা আটকে থাকার পর এক গর্ভবতী নারী ও তার সন্তানসহ ১১ জনকে বিএসএফ ফেরত নিয়ে যায় বলে জানিয়েছে বিজিবি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গে মার্চ মাসের নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় দ্রুত ও বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় ৯০ লাখেরও বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়। এতে আটক ও বহিষ্কারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর আগে আসামে ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ায় ১৯ লাখের বেশি মানুষ রাষ্ট্রহীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছিল।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বারবার বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি দাবি করেন, সীমান্তের কাছে নিয়ে গিয়ে অনেককে সরাসরি সীমান্ত পার করে দেওয়া হয়েছে।

পঞ্চগড় সদর ইউনিয়নের এক জনপ্রতিনিধি হাসিবুর ইসলাম জানান, তিনি পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির একটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন, যাদের আধার কার্ড ছিল। কিন্তু ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পর পুলিশ তাদের আটক করে বিএসএফের হাতে তুলে দেয়। পরে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, কেউ যদি স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরতে চান, তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে জোরপূর্বক বহিষ্কার বা চাপ সৃষ্টি করে প্রত্যাবাসন সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।

সংস্থাটির দাবি, পশ্চিমবঙ্গে শত শত সন্দেহভাজন বাংলাদেশি অভিবাসীকে আটক কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। তাদের অধিকাংশই মুসলিম, যদিও কিছু হিন্দুও রয়েছেন। অনেকের ক্ষেত্রে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়াই গ্রেফতার ও আটকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে জানিয়েছে, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া সীমান্তে ঠেলে দেওয়া কাউকে গ্রহণ করা হবে না। নাগরিকত্ব যাচাই ও প্রচলিত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া মেনেই যেকোনো প্রত্যাবর্তন হতে হবে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী ভারত প্রত্যেক ব্যক্তির অধিকার সুরক্ষায় বাধ্য। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক বা বহিষ্কার করা মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন। খাদ্য, পানি, আশ্রয় ও চিকিৎসা ছাড়া সীমান্তে আটকে রাখা নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণের শামিল হতে পারে।

Advertisement

Advertisement

মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘কোনো মানুষের নাগরিকত্ব যাই হোক না কেন তাকে দুই দেশের সশস্ত্র সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাঝখানে খোলা মাঠে রাত কাটাতে বাধ্য করা উচিত নয়। ভারতকে এসব নির্মম বহিষ্কার বন্ধ করতে হবে এবং উভয় দেশকে নিশ্চিত করতে হবে যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কখনোই মানুষের মৌলিক মর্যাদার বিনিময়ে পরিচালিত হবে না।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অন্যান্য লেখা সমূহ