• আজ- মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬, ০৬:০২ অপরাহ্ন

পাঁচ কারণে তৃণমূল কংগ্রেসের বিপর্যয়

রিপোর্টার: / ১২ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গে সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে ভোটগণনা শেষে ফল প্রকাশিত হলেও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেত্রী মমতা ব্যানার্জী আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো পরাজয় স্বীকার করেননি – বরং তিনি অভিযোগ করেছেন নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় বিজেপি অন্তত একশোটি আসন তাদের কাছ থেকে ‘লুট করে নিয়েছে’।

মঙ্গলবার (৫ মে) বিকাল চারটায় মমতা ব্যানার্জী ও অভিষেক ব্যানার্জী কলকাতার কালীঘাটে একটি সাংবাদিক বৈঠক করবেন বলেও কথা রয়েছে– যেখানে কীভাবে তৃণমূল কংগ্রেসকে ‘হারিয়ে দেওয়া হয়েছে’ সেটা তারা সবিস্তারে ব্যাখ্যা করবেন বলে দলীয় সূত্রে আভাস মিলেছে।

স্পষ্টতই, নির্বাচনে জনতার রায়ে তাদের পরাজয় হয়েছে এটা তৃণমূল এখনো মানতে প্রস্তুত নন। বরং তারা যুক্তি দিচ্ছেন, লাখ লাখ মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে যে নির্বাচন তা কখনোই সুষ্ঠু ও অবাধ বলে মানা যায় না।

তবে রাজ্যে যে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি গরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপি প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসতে চলেছে, সেই বাস্তবতা তাতে পালটাচ্ছে না।

পরাজয়ের পেছনে দলীয় নেতৃত্ব যাই যুক্তি দিক, ১৫ বছর ধরে একটানা ক্ষমতায় থাকার পর তৃণমূল কংগ্রেসের এই নির্বাচনী বিপর্যয়ের কারণ কী হতে পারে?

সোমবার (৪ মে) গভীর রাত পর্যন্ত প্রাপ্ত ফলাফল ও রাজ্যে বিভিন্ন এলাকায় তৃণমূল ও বিজেপির তুলনামূলক পারফরমেন্স বিশ্লেষণ করে বিবিসি বাংলা এর পেছনে যে মূল পাঁচটি কারণকে চিহ্নিত করেছে, সেগুলোই নিচে একে একে তুলে ধরা হলো।

নারী ভোটব্যাংকে ধস?

পশ্চিমবঙ্গের নারী ভোটের (যা ৫০ শতাংশেরও বেশি) বেশিটাই যে এতকাল মমতা ব্যানার্জীর দল পেয়ে এসেছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’, ‘কন্যাশ্রী’ বা ‘সবুজ সাথীর’ (ছাত্রীদের মধ্যে সাইকেল বিতরণ) মতো ডাইরেক্ট বেনেফিট প্রকল্প তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে নারী ভোটারদের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছিল।

কিন্তু এবারে সেই ভোটব্যাংকে অবধারিত ফাটল ধরেছে– যার একটা বড় কারণ হতে পারে নারী সুরক্ষার মতো ইস্যুতে তৃণমূল কংগ্রেসের চরম ব্যর্থতা।

দুবছর আগে কলকাতায় একজন কর্তব্যরত চিকিৎসক সরকারি হাসপাতালে ডিউটি দেওয়ার সময় ধর্ষণের শিকার ও নিহত হয়েছিলেন– সেই ‘অভয়ার’ বিচারের দাবিতে সংগঠিত আরজিকর আন্দোলন এবারের ভোটে অবশ্যই প্রভাব ফেলেছে।

এর একটা বড় প্রমাণ পানিহাটির মতো তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটিতেও আরজিকরের নির্যাতিতার মা বিজেপি প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন।

এসআইআরে ক্ষতির ধাক্কা: 

এসআইআর বা ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের ফলে পশ্চিমবঙ্গে যে ৯০ লাখেরও বেশি নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাতে তৃণমূল কংগ্রেসই যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তা এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।

যদিও আসনভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করলে এ ক্ষতির পরিমাণ ও ব্যাপকতা আরও পরিষ্কার বোঝা যাবে, তবে তা সত্ত্বেও এটা বোঝাই যাচ্ছে এ গোটা প্রক্রিয়ায় মোটের ওপর লাভবান হয়েছে বিজেপিই।

তবে এ তালিকায় লাখ লাখ বৈধ ভোটার বাদ পড়েছেন সেটা যেমন ঠিক– কিন্তু বহু ভুয়া বা মৃত ভোটারেরও নাম যে বাদ পড়েছে তাতেও কোনো সন্দেহ নেই।

বিজেপি আগোগোড়াই দাবি করে এসেছিল তালিকায় এ সব ভুয়া নামের কারণে তৃণমূল বছরের পর বছর ধরে ভোটে সুবিধা পেয়ে এসেছে– যা এবার বন্ধ হবে। দেখা যাচ্ছে সেই বক্তব্য অনেকটাই সত্যি প্রমাণিত হলো।

মমতা ব্যানার্জী সরকারের দুর্নীতি ও ব্যর্থতা: 

তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনে তাদের বিরুদ্ধে যে পরিমাণ দুর্নীতি, অপশাসন, দৈনন্দিন জীবনে কাটমানি ও ‘সিন্ডিকেট রাজের’ বাড়বাড়ন্ত এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগে উঠেছে, তা পশ্চিমবঙ্গে আর কোনো আমলে উঠেছে কি না সন্দেহ।

তার সঙ্গে এই ১৫ বছরে রাজ্যে যুবক-যুবতীদের জন্য নতুন চাকরি বা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও মমতা ব্যানার্জী সরকার চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ভোটের ঠিক আগে বেকারদের জন্য মাসিক ১৫০০ টাকা ভাতা চালু করেও সেই হতাশায় প্রলেপ দেওয়া যায়নি।

কিন্তু বাঙালির আত্মাভিমান, নারীদের জন্য নানা সমাজকল্যাণ প্রকল্প, অসাম্প্রদায়িকতা– এ ধরনের নানা হাতিয়ারকে ব্যবহার করে ২০১৬ বা ২০২১-এও তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনি বৈতরণী পেরোতে কোনো অসুবিধা হয়নি।

এবারেও এসআইআরের কারণে রাজ্য জুড়ে লাখ লাখ বৈধ ভোটারের যে অমানুষিক ভোগান্তি হয়েছে সেটাকে প্রচারের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জী, তার জন্য সুপ্রিম কোর্টে নিজে সওয়াল করা-সহ কোনো চেষ্টাই বাদ রাখেননি তিনি।

কিন্তু তারপরও দেখা গেল দুর্নীতি ও ব্যর্থতার অভিযোগকে ঢাকতে সেটা যথেষ্ঠ হলো না – ২০২৬-এ এসে তৃণমূল কংগ্রেসকে বেশ চড়া মাশুলই দিতে হলো।

হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণ?:

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন মমতা ব্যানার্জীর একটানা নির্বাচনি সাফল্যের পেছনে একটা বড় কারণ হলো রাজ্যের মুসলিমদের প্রায় একচেটিয়া সমর্থন তিনি পেয়ে এসেছেন।

পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার মোটামুটি ৩০ শতাংশের কাছাকাছি মুসলিম– আর এর মধ্যে ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ ভোটই বরাবর তৃণমূল কংগ্রেস পেয়ে এসেছে।

কিন্তু এবারে সেই প্রক্রিয়ার পালটা একটা হিন্দু ভোটের ‘কনসলিডেশন’ হয়েছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে– যার সুফল অবশ্যই বিজেপি পেয়েছে।

যে কারণে তারা মুসলিম-গরিষ্ঠ জেলা মালদা বা মুর্শিদাবাদেও বেশ কিছু আসন পেয়েছে।

অন্যদিকে মমতা ব্যানার্জী তার বিরুদ্ধে ‘মুসলিম তোষণের’ অভিযোগ খারিজ করতেই সম্ভবত হালে রাজ্যে সরকারি খরচে একের পর এক হিন্দু মন্দির স্থাপন করেছিলেন।

কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে এই ‘সফট হিন্দুত্ব’ কাজে আসেনি, রাজ্যের বেশিরভাগ হিন্দু বরং ‘হিন্দুত্ববাদী’ বিজেপিকেই বেছে নিয়েছেন।

শাসক দল হিসেবে সুবিধা না পাওয়া:

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাজ্যের শাসক দল ভোটের সময় কিছুটা বাড়তি সুবিধা পেয়েই থাকে– যেটা এবারে তৃণমূল কংগ্রেস পায়নি বললেই চলে।

নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার পরের মুহূর্ত থেকেই জাতীয় নির্বাচন কমিশন রাজ্য প্রশাসনের হাত থেকে রাশ তুলে নিয়েছে, ঢালাওভাবে জেলা শাসক ও পুলিশ সুপারদের তারা বদলে দিয়েছে।

সেই সঙ্গে ভোটের বেশ কদিন আগে থেকেই রাজ্যে মোতায়েন করা হয়েছে দুই লাখ ৪০ হাজারের বেশি কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী– যে সংখ্যা ছিল অভূতপূর্ব।

অনেকেই বলছেন, এই বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতির কারণেই ভোট এতো শান্তিপূর্ণ হয়েছে এবং মানুষ এতো নিশ্চিন্তে ও নিরুপদ্রবে ভোট দিতে পেরেছেন।

তৃণমূল কংগ্রেস গত দেড় মাসে লাগাতার কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ করে গেছে– সেটার কারণ কী ছিল, তাও বোধহয় এখন আন্দাজ করা যাচ্ছে।

অন্যভাবে বললে, নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকাও তৃণমূল কংগ্রেসের বিপক্ষেই গেছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অন্যান্য লেখা সমূহ