
নিজস্ব প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে সরকারি খাল ইজারার নামে বাধঁ নির্মান করে অবৈধভাবে দখলের অভিযোগ উঠেছে। বাঁধ নির্মানের কারনে পানির প্রাকৃতিক প্রবাহ বন্ধ থাকায় ক্ষতির মুখে পড়েছে প্রায় ২ থেকে আড়াই হাজার বিঘা ফসলি জমির ক্ষেত। স্থায়ী জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে ১৫ থেকে ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ। ১২ থেকে ১৫ গ্রামের পানিও নিষ্কাশন হয় এই খাল দিয়ে। ফলে বিপর্যয় ঘটছে পরিবেশের।
এদিকে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা খালটিকে নিজেদের পৈত্রিক সম্পত্তি দাবি করলেও স্থানীয়রা খাস সম্পত্তি কিভাবে পৈত্রিক সম্পত্তি হয় সেটি খতিয়ে দেখার আবেদন করেছেন। ইতোমধ্যে স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সরেজমিনে পরিদর্শনও করেছেন।
অভিযোগে জানা গেছে, কালিগঞ্জ উপজেলার মথুরেশপুর ইউনিয়নের প্রায় ১০টি গ্রাম ও ৯টি মৌজার বিস্তীর্ণ বিলের মধ্য দিয়ে প্রায় ৩শ বছরের পুরাতন একটি প্রাচীন খাল প্রবাহিত হয়ে আসছে। খালটি অত্র অঞ্চলের পানি নিস্কাশনের একমাত্র মাধ্যম। খালটির সাথে অন্যান্য শাখা খাল যুক্তহয়ে বাংলাদেশ এবং ভারতের সীমান্তবর্তী ইছামতি ও কালিন্দি নদীতে মিশেছে। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালী ও দুর্নীতিগ্রস্ত আব্দুল গফফার, শেখ রহমত আলী, হাসান আলী, ইউনুছ আলী, রজব আলী, রওশন আলী, মাহামুদ আলী, শান্তি কুমার ঘোষ, আবুল কালাম, আব্দুল ওহাব, আব্দুল গাজী সহ অন্যান্য ব্যক্তির নিজেদের স্বার্থে সরকারের কাছ থেকে কিছু শর্ত সাপেক্ষে বন্ধোবস্ত নেয়। বন্ধোবস্তকৃত জমির অভ্যন্তরে, প্রবাহিত কোন নদী-নালা বা খাল ভরাট করে কিংবা তার উপর বাঁধ দিয়ে বন্ধ করা, নৌ চলাচল, পানি নিষ্কাশনের বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না মর্মে শর্ত থাকলেও। কোন শর্ত না মেনেই ওই প্রভাবশালী মহল অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে খালের পানির প্রাকৃতিক প্রবাহ ব্যহত করে একাধিক স্থানে বাঁধ নির্মাণ করে মৎস্য চাষ করছে। ফলে খালের পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে আজ প্রায় মৃত খালে পরিণত হয়েছে।
মুকুন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা গোলাম ফারুক, হাবিবুল্লাহসহ কয়েক জানান, অত্র বিলে শতশত মৎস্য খামার মাছ চাষের জন্য পর্যাপ্ত পানি পায় না, বর্ষা মৌসুমে ফসলি জমিতে পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে, ধান ও অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফসলি জমি, বসত ভিটা পুকুর, মৎস্যঘের সমূহ পানিতে নিমজ্জিত হয়ে কোটি কোটি টাকার সম্পদ, মানুষের জান মাল, গবাদি পশুর অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়া মারাত্মকভাবে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটবে বলে মনে করেন তারা।
এদিকে ২০১০ সালে তৎকালিন উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবুল কালাম আজদ স্বাক্ষরিত একপত্রে উক্ত খালটিকে খাস খাল হিসেবে উল্লেখ করে তা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে খননের জন্য মথুরেশ ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমানকে নির্দেশ দেন।
মুকুন্দপুর তালতলা খাল এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সালাম, মহিদুল ইসলাম, রফিকুল ইসলামসহ অনেকেই জানান, স্থানীয়দের জলাবদ্ধতার নিস্কাশন এবং পানির সংকট মেটাতে ২০২১ সালে বিএসডিসির অর্থায়নে খালটি খনন করা হয়। এরপর থেকে খালটি উন্মুক্ত ছিলো। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে উল্লেখিত ব্যক্তিরা বাঁধ নির্মাণ করে অবৈধভাবে দখল করে। এর প্রতিকার চেয়ে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছি।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরেজমিনে তদন্তপূর্বক রিপোর্ট প্রদানের জন্য সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেন। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার কে সরেজমিনে তদন্তের নির্দেশ দেন। গত ২০ সেপ্টেম্বর উপজেলা নির্বাহী অফিসার অনুজা মন্ডল সরেজমিনে তদন্তও করেছেন।
তবে অভিযুক্তদের মধ্যে মোস্তাফিদ লিটন জানান, তার দাদা ১৯৬৭ সালে সরকারের কাছ থেকে রেজিষ্ট্রি মূলে ক্রয় করেন। বর্তমান হাল জরিপে তাদের নামেই খতিয়ানভুক্ত হয়েছে। তাদের রেকর্ডীয় ব্যক্তি সম্পত্তি। এখানে আগে খাল ছিল না।
কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার অনুজা মন্ডল জানান, ভূমি মন্ত্রনালয়ের চিঠি পেয়ে সরেজমিতে তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করেছি। এখানে একটি পক্ষ হাইকোর্টে আবেদন করেছে মর্মে একটি পত্রও আমাকে দিয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয়রা খালটি অবমুক্তর জন্য আবেদন জানিয়েছেন। উভয়পক্ষের বক্তব্যসহ প্রতিবেদন ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠাবো। মন্ত্রণালয় পরবর্তীতে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
পরিবেশ আইনবিদ সংগঠন (বেলা) খুলনার বিভাগীয় সমন্বয়ক মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, বিষয়টি শুনেছি। সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে খালটি অবমুক্তের জন্য স্থানীয়দের সাথে কাজ করবো।