
অনলাইন ডেস্ক: সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির দাবি, তাকে ঘিরে সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন ঘটনার বিষয়ে সাংগঠনিক তদন্তে তার ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হয়েছে। সেজন্য গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বুধবার (২২ জুলাই) বিকালে দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়।
বহিষ্কার হলেও সংসদ সদস্য পদ হারানোর সম্ভাবনা কতটা? বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে গণমাধ্যমে আলোচনা হচ্ছে। রাজনীতিবিদ থেকে শুরু আইনজীবীরা পক্ষে-বিপক্ষে মত দিয়েছেন।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি সংগঠনের গঠনতন্ত্রে বর্ণিত বিধি লঙ্ঘন করে ও নৈতিকতার সীমা ছাড়িয়ে যায়, অথবা তার ভূমিকার মাধ্যমে যদি সংগঠনের সুনাম ও মর্যাদা বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, তখন তার সদস্য পদ তো বাতিল হবেই। এমনকি তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করারও বিধান আছে। সদস্য পদ বাতিল হলে সংগঠনে সে থেকে যাবে, কাজ করতে পারবে। আর বহিষ্কার মানে সংগঠন থেকেই বহিষ্কার।
নজরুল সংসদ সদস্য পদ হারাবে কিনা এ বিষয়ে সংসদ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ জানান, জামায়াতে ইসলামী গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কার হলেও তার সংসদ সদস্য পদ যাবে না।
তিনি বলেন, নৈতিক স্খলনজনিত কোনো বিষয় যদি সংসদের ইনকোয়ারি কমিটিতে প্রমাণিত হয়, তাহলে তার পদ যেতে পারে। এটার জন্যও সংসদীয় তদন্ত লাগবে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেন, দলের নিয়ম কানুন ভঙ্গ করলে সাধারণত দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু সংসদ সদস্য পদ হারাবে তখনই, যখন কেউ দলের বিপক্ষে সংসদে ভোট দেয় অথবা পদত্যাগ করে। এছাড়া নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে ফৌজদারি বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারো যদি দুই বছরের বেশি কারাদণ্ড হয়, তখন।
তিনি আরও বলেন, তবে এখানে একটা অস্পষ্টতা আছে। সব অপরাধের জন্য এটা হবে না, শুধু নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে হবে। এখন কোনটা নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ, আর কোনটা না, সেটার কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা নাই। কোর্টের রায়েও এ নিয়ে কিছু আসে নাই।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সিনিয়র আইনজীবী ব্যরিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন যুগান্তরকে টেলিফোনে বলেন, সংবিধান ও আইন অনুযায়ী গাজী নজরুল সংসদ সদস্য পদে থাকতে পারবেন না। কারণ নৈতিক স্খলনের কারণে তার দল তাকে বহিষ্কার করেছে। এক্ষেত্রে সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ কার্যকর হবে। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত এক্ষেত্রে চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি ১৯৯৬ সালের পার্লামেন্টে বিএনপির তৎকালীন সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। ব্যারিস্টার খোকন জানান, ফ্লোর ক্রসিংয়ের কারণে আখতারকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তিনি কোর্টে গিয়েছিলেন। তখন আমি বিএনপি পক্ষে লড়েছিলাম। ওই মামলায় আখতার হেরে গিয়েছিলেন, তথা তার সংসদ সদস্য পদ হারাতে হয়েছিল।
গাজী নজরুল ইসলামের বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের পর তাকে নিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। তিনি লেখেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে আছে ‘পদত্যাগ’। তিনি (গাজী নজরুল ইসলাম) হয়েছেন ‘বহিষ্কার’। জামায়াত আজকেই নির্বাচন কমিশনকে জানিয়ে (তাকে বহিষ্কারের বিষয়ে) দিচ্ছে। কারণ ‘নৈতিকস্খলন’। প্রশ্ন হচ্ছে সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন কি না? আমার মতে না।
তবে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য যে রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দল থেকে পদত্যাগ করলে, দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে বা ভোটদান থেকে বিরত থাকলে, কিংবা অনুচ্ছেদে বর্ণিত অন্যান্য পরিস্থিতির উদ্ভব হলে তার সংসদ সদস্যপদ শূন্য হতে পারে। তবে অনুচ্ছেদ ৭০-এ দল কর্তৃক বহিষ্কার (expulsion) কে সংসদ সদস্যপদ শূন্য হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে, কেবল নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার কারণে কোনো সংসদ সদস্যের সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে এমনটি সংবিধানের ভাষা থেকে বলা যায় না। তবে বহিষ্কারের পর যদি তিনি অনুচ্ছেদ ৭০-এ বর্ণিত অন্য কোনো পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন, তাহলে বিষয়টি ভিন্নভাবে বিবেচিত হতে পারে। অতএব, বিদ্যমান সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী, শুধুমাত্র বহিষ্কারই সংসদ সদস্যপদ শূন্য করার জন্য যথেষ্ট আইনগত ভিত্তি নয়। কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সদস্যপদ শূন্য হওয়ার প্রশ্ন সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী নির্ধারিত হবে এবং প্রয়োজনে তা আদালতের বিচারিক পর্যালোচনার বিষয় হতে পারে।
যদি কোনো বিরোধ সৃষ্টি হয়— কোনো এমপি অনুচ্ছেদ ৭০ অনুযায়ী আসন হারিয়েছেন কিনা— তাহলে সংবিধানের ৬৬(৪) অনুযায়ী বিষয়টি নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিষ্পত্তি করবে এবং কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান বলেন, এক্ষেত্রে ইসির সিদ্ধান্তই অ্যাবসলিউট না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দল কিংবা ইসির সিদ্ধান্ত মেনে নিতেও পারেন। আবার না মানলে হাইকোর্টে রিটও করতে পারেন। সেখানেও সমাধান না হলে আপিলেট ডিভিশনে যাওয়ার সুযোগ আছে।
চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, বিষয়টি গণমাধ্যম থেকে জেনেছি। আসলে ঘটনাটি সঠিক কিনা, তা নিশ্চিত নই। তিনি কারো ষড়যন্ত্রের শিকারও হতে পারেন। তারপরও বলব— তিনি যদি অপরাধী হয়ে থাকেন, তাহলে আদালত সেটি দেখবে। এরপর ব্যবস্থা নেবে নির্বাচন কমিশন। তবে তিনি তার দল থেকে পদত্যাগ করলে, আসনটি শূন্য ঘোষণা হবে। সে ক্ষেত্রে ৯০ দিনের মধ্যে উপনির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
বুধবার (২২ জুলাই) বিকালে এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘আজ ২২ জুলাই (বুধবার) বিকাল ৪টায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজধানীর মিন্ট রোডস্থ বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের আমির ডা. শফিকুর রহমান (এমপি)। বৈঠকে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।’
এতে আরও বলা হয়েছে, ‘সম্প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত বিষয়ে সাংগঠনিক তদন্তে তার নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় তাকে গঠনতন্ত্রের ৬২নং ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।’
একই সঙ্গে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে অবহিত করার সিদ্ধান্ত হয় বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।