
নিজস্ব প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় নেতৃত্বদানকারী ও মামলার প্রধান আসামি কারী ফজলুল হক আমিনীকে গ্রেপ্তারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তার মুক্তির দাবিতে প্রচারণা শুরু হয়েছে। পেশায় ভাড়ায় মোটরসাইকেলচালক এবং সুযোগ বুঝে ‘প্রক্সিতে ইমামতি’ করা আমিনী হত্যাকাণ্ডের পরও কোনো অনুশোচনা প্রকাশ না করে বরং ‘গর্ববোধ’ করেছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশ আমিনীকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনলেও ফেসবুকে বেশ কিছু আইডি ও পেজ থেকে তাকে ‘উম্মাহর বীর’, ‘মুসলিম বঙ্গের ইলমুদ্দীন’, ‘বাংলার সিংহ পুরুষ’ ও ‘দ্বীনের মুজাহিদ’ আখ্যা দিয়ে দ্রুত মুক্তির দাবি জানানো হচ্ছে। কি-ওয়ার্ড সার্চ করে গত দুই দিনে অন্তত ১০০টির বেশি পোস্ট পাওয়া গেছে। যেখানে আমিনীর গ্রেপ্তারের ছবি ও ভিডিও পোস্ট করে নানা উপাধিতে ভূষিত করে তার মুক্তি চাওয়া হচ্ছে।
অনুসন্ধান অনুযায়ী, এই প্রচারণায় যুক্ত হয়েছেন ‘অ্যান্টি শাতিম মুভমেন্ট’ শুরু করা, বিভিন্ন ইস্যুতে বিতর্কিত এবং অনলাইনে আল-কায়েদার মতাদর্শ প্রচারকারী আতাউর রহমান বিক্রমপুরী। তিনি শামীম হত্যার পর অন্তত ১০টি পোস্ট নিজের প্রোফাইলে শেয়ার করেছেন। গত ১৯ অক্টোবর এক ফটোকার্ড পোস্ট করে তিনি দাবি করেন, রাসুলের অবমাননাকারীকে হত্যা করা সরকারের দায়িত্ব ছিল এবং আমিনী তা পালন করায় তাকে পুরস্কৃত করা উচিত ছিল। এ ছাড়া তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-পন্থী লেখালেখি করা ‘আবু উসামা’ নামক একটি আইডি থেকেও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে তাৎক্ষণিক পিটিয়ে হত্যাকে সমর্থন জানিয়ে পোস্ট দেওয়া হয়েছে।
কারিম শাওন নামের এক ইসলামি লেখক ফেসবুকে লেখেন, নিহত ব্যক্তির পক্ষে ওকালতি করা যাবে না এবং গ্রেপ্তারকৃতদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে; অন্যথায় আলেম সমাজ এই রাষ্ট্রকে ‘দারুল হারব’ ঘোষণা করতে বাধ্য হবে। মঙ্গলবার সকালে মো. আবুল কাসেম নামের একটি আইডি থেকে ‘দল যার যার, নাস্তিক পেটানোর দায়িত্ব সবার’ শিরোনামে পোস্ট দিয়ে আমিনীর নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানানো হয়।
এ ছাড়া এ এইচ রাফি এবং মোহাম্মদ মুজতাহিদুল ইসলাম আকিল নামের আইডিসহ আরও একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে আমিনীকে ‘নবীর ইজ্জতের পাহারাদার’ ও ‘দ্বীনের মুজাহিদ’ আখ্যা দিয়ে তার মুক্তির আহ্বান জানানো হয়। দেশের পরিচিত ইসলামি বক্তা ড. এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী এক মাহফিলে সাতক্ষীরার এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নিহত শামীমকে ‘শাতেম’ আখ্যা দেন।
তিনি বলেন, “সাতক্ষীরার দেবহাটায় এক বেয়াদব বেঈমান আল্লাহর হাবীব নবীজি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু সাল্লামের আরশচুম্বি শানমানের খেলাফ এবং ইসলাম ধর্মের বিপক্ষে বক্তব্য দিয়েছে, স্থানীয় জনগণ তাকে গণপিটুনি দিয়ে জাহান্নামে পাঠায় দিছে, বলেন আলহামদুলিল্লাহ।”
তিনি আরও দাবি করেন, অবমাননাকারীদের প্রতিরোধে প্রচলিত আইনে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান না থাকায় তৌহিদি জনতা আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বাধ্য হয়। রাষ্ট্র আইন না করলে জনগণ তা হাতে তুলে নেবে উল্লেখ করে আব্বাসী বলেন, “আমরা বরং বলব সেই মর্দে মুজাহিদ যে ব্যক্তি (ফজলুল হক আমিনী) এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নেতৃত্ব দিয়েছে তাকে বেকসুর খালাস দেওয়া হোক।”
আমিনী গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার ঋণ পরিশোধের কথা বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিকাশ ও নগদ নম্বর ছড়িয়ে দিয়ে সাহায্য চাওয়া হচ্ছে। ‘আল – ইনতিশার’ নামের একটি ফেসবুক পেজে পোস্ট দিয়ে দাবি করা হয়, আমিনীর প্রায় দেড় লাখ টাকা ঋণ রয়েছে এবং শহীদের সব গুনাহ মাফ হলেও ঋণের দায় থাকে। এই যুক্তিতে তার ভাইয়ের ছেলের বিকাশ ও নগদ নম্বর দিয়ে আর্থিক সহযোগিতা পাঠানোর আহ্বান জানানো হয়। একই বয়ানে আরও কয়েকটি পেজ ও আইডিতেও পোস্ট দেখা গেছে।
শামীম হত্যাকাণ্ডের পর গত ১৫ অক্টোবর সকালে দ্য ডিসেন্টের সঙ্গে কথা বলেছিলেন কারী ফজলুল হক আমিনী। তখন তিনি স্পষ্ট জানান, এ ঘটনায় তিনি মোটেও অনুতপ্ত নন এবং কোনো ভয়ও পাচ্ছেন না; বরং তিনি গর্বিত।
গত মঙ্গলবার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে দেবহাটার সুবর্ণাবাদ গ্রামের বাসিন্দা ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই আবদুল জলিল বাদী হয়ে ১০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করে দেবহাটা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার প্রধান আসামি করা হয় ফজলুল হক আমিনীকে।
হত্যাকাণ্ডের পর আত্মগোপনে চলে যান আমিনী। পরবর্তীতে গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাত ১১টার দিকে কালিগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণনগরের এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে পুলিশ ও র্যাবের যৌথ অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে এই মামলার এজাহারভুক্ত অপর দুই আসামি মোক্তার হোসেন খান (৫৩) ও আসাদুল ইসলাম মোল্যাকে (৪৬) গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
অনুসন্ধান ও ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, স্বঘোষিত মুফতি ফজলুল হক আমিনীর সাথে শামীম হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নিয়েছিল দেবহাটার কুলিয়া ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি সাদিকুল ইসলাম, পারুলিয়া ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক গোলাম রসূল, দক্ষিণ পারুলিয়ার শওকত হোসেনের ছেলে সাবেক যুবদল ও বর্তমান বিএনপি নেতা সাদিকুল ইসলাম, ঘলঘলিয়ায়র গোলাম বারির ছেলে শিবিরকর্মী ও পারুলিয়ার গ্রীলমিস্ত্রি মিজানুর রহমান, নিশ্চিন্তপুরের জাহাঙ্গীরের ছেলে আজহারুল ইসলাম, দক্ষিণ পারুলিয়া গাজীবাড়ীর মজিদ ওরফে চা মজিদের ছেলে মাসুম, পারুলিয়া তিবরপাড়া মন্দির এলাকার আমিরুলের ছেলে জাবির আকরাম, নিশ্চিন্তপুরের শফিকুলের ছেলে নাজমুল হোসেন সহ দুই শতাধিক কথিত ‘তৌহিদী জনতা’। যাদের বেশিরভাগই জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রশিবির এবং বাকিরা বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়।
প্রথম দফায় বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে শামীমকে পেটানো থেকে শুরু করে কুলিয়ার পল্লী চিকিৎসকের চেম্বারে হামলা ও গণপিটুনি এবং সর্বশেষ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হামলা চালিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডাক্তারের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে শামীমকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করে। আর ছাত্রশিবিরের এই উগ্রপন্থী কিশোর গ্যাংয়ের প্রধান দক্ষিণ পারুলিয়ার বাসিন্দা ও জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আলহাজ্ব মাহবুবুল আলমের ছেলে শিবির নেতা মাসুদ আল আজম ওরফে মাসুদ।
একসময় আওয়ামী লীগের ছাঁয়ায় থাকা কিশোর গ্যাং লিডার মাসুদ আল আজম বেপরোয়া হয়ে ওঠে ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তন থেকে। শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির দিন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত দেবহাটায় সংঘটিত একের পর এক মব সন্ত্রাস, ভাঙচুর, লুটপাট ও দখলের নেপথ্যে রয়েছেন এই জামায়াত নেতার পুত্র ও কিশোর গ্যাং প্রধান মাসুদ।
অথচ, হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততা থাকলেও কুলিয়া ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি সাদিকুল ইসলাম, হত্যার পর থেকে পলাতক থাকা পারুলিয়া ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক গোলাম রসূল, কিশোর গ্যাং প্রধান মাসুদ আল আজমসহ উল্লিখিতদের অনেককেই চাঞ্চল্যকর এ মামলার এজাহার নামীয় আসামি করা হয়নি। আর আসামি হয়েও বর্তমানে পলাতক শামীমের বুকে দাঁড়িয়ে তাণ্ডব চালানো বিএনপি নেতা সাদিকুল ইসলামসহ অন্যান্য আসামিদের এখনও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
অন্যদিকে, ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা দ্য ডিসেন্টের প্রতিবেদনে উঠে আসা ভয়াবহ তথ্য বলছে, ফেসবুক লাইভে শপথ নিয়ে দফায় দফায় শামীমকে পিটিয়ে হত্যার প্রধান মাস্টারমাইণ্ড মুফতি ফজলুল হক আমিনীকে ‘উম্মাহর বীর’, ‘মুসলিম বঙ্গের ইলমুদ্দীন’, ‘বাংলার সিংহ পুরুষ’ ও ‘দ্বীনের মুজাহিদ’ আখ্যা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্যাম্পেইনসহ তাকে মুক্ত করার মিশনে নেমেছে এন্টি শাতিম মুভমেন্ট’ শুরু করা, বিভিন্ন ইস্যুতে বিতর্কিত এবং আল-কায়েদার মতাদর্শ অনলাইনে প্রচারকারী আতাউর রহমান বিক্রমপুরী, এমনকি তেহরিকই তালেবান পাকিস্থান বা টিটিপি-পন্থী লেখালেখি করা আবু উসামা নামক ফেসবুক আইডিসহ উগ্রপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদি সংগঠনের সমর্থকরা।
একদিকে মামলার এজাহার নামীয় আসামী থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া একাধিক হত্যাকারির প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো, সাথে ফজলুল হক আমিনীকে ছাড়াতে বিচ্ছিন্নতাবাদি সংগঠনের গৎপরতায় আরও নিরাপত্তা শঙ্কায় ভুগছেন নিহতের পরিবার। দলীয় সাইনবোর্ডের জোরে হত্যার নেপথ্যে থেকেও অনেকেই পার পেয়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা তাদের।
হত্যার সুষ্ঠ তদন্ত এবং ছড়িয়ে পড়া উস্কানিমুলোক ও স্পর্শকাতর সব ভিডিও বিশ্লেষণ করে অবিলম্বে হত্যায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি তুলেছে এইচআরএসএসসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। একই সঙ্গে নিহতের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের আইনি সহায়তা দেওয়ারও দাবি জানিয়েছে সংগঠনগুলো।
মামলার এজাহারনামীয় আসামি ও পলাতক হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে দেবহাটা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এইচ এম শাহীন বলেন, “একাধিকবার ও স্থানে হামলা এবং পিটিয়ে শামীমকে হত্যা করা হয়। তাৎক্ষণিক হওয়া মামলায় ১০ জনকে এজাহার নামীয় করলেও অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। দফায় দফায় প্রত্যেকটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন, প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি ও ভাইরাল হওয়া প্রত্যেকটি ভিডিও ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে।
“উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সিসি ফুটেজ সংরক্ষণ ও হামলার আগে হাসপাতালের বিদ্যুৎ বন্ধের ঘটনাও তদন্ত করা হচ্ছে। পলাতকদের গ্রেপ্তারে পুলিশি অভিযান অব্যহত রয়েছে। দলীয় সাইনবোর্ড বা কোনোভাবেই হত্যায় সম্পৃক্ত কেউ পার পাবে না” বলেন তিনি।