
অনলাইন ডেস্ক: নির্বাচিত সরকারের আড়াই মাস না যেতেই চট্টগ্রামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল-শিবিরের মধ্যে বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটল মঙ্গলবার। গণ-অভ্যুত্থানের অংশীদার এই দুটি ছাত্র সংগঠনের মধ্যে এই সংঘাতে রক্ত ঝরেছে ২০-৩০ জনের। সংঘর্ষের ঘটনা ক্যাম্পাসে হলেও সংঘাতে দুইপক্ষেই অংশ নিয়েছে অনেক বহিরাগত। যাদের অনেকের হাতে ছিল রাম দা, কিরিচ, লোহার রডসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র। ক্যাম্পাস দখলে বহিরাগতদের যুক্ত করার এমন ঘটনায় সাধারণ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ ক্যাম্পাসের একটি দেওয়ালে গ্রাফিতির নিচে ‘ছাত্র’ মুছে ‘গুপ্ত’ লেখাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘটিত সংঘর্ষের ঘটনায় বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম নগরী। ঘটনার জন্য দুই সংগঠনই পরস্পরকে দায়ী করে নগরীতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করেছে। পুলিশ কমিশনারকেও তারা স্মারকলিপি দিয়েছে। তবে বুধবার সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো পক্ষই মামলা দায়ের করেনি।
পুলিশ বলছে হামলায় জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। মঙ্গলবারের সংঘর্ষের ঘটনায় কলেজ কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি করে ৭ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশ ঠেকাতে পুলিশের সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে। ক্যাম্পাসে বর্তমানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
সংঘাতে অংশ নেওয়া দুইপক্ষের সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন ছবি-ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে দেখা যায়, রাম দা, কিরিচ, রড নিয়ে একপক্ষ অপরপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে।
অস্ত্রধারীদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিল বহিরাগত। এ সময় শিবিরের হয়ে হামলায় যোগ দেন রিয়াজউদ্দিন বাজার ও টেরীবাজারের বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী নেতাও।
হামলায় কিরিচ হাতে অংশ নেন ওমরগণি এমইএস কলেজ ছাত্রদলের সদস্য সচিব মির্জা ফারুক। নীল জিন্সের শার্ট পরিহিত মির্জা ফারুককে দেখা যায় ধারালো কিরিচ হাতে প্রতিপক্ষের দিকে তেড়ে যেতে। একইভাবে লোহার রড হাতে প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা যায় চট্টগ্রাম কলেজ শিবির নেতা তামীমকে। তার বাড়ি চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার বড়হাতিয়ায়। হামলায় আরও অনেককে দেখা গেছে, যাদের হাতে দেশীয় অস্ত্র ছিল। তবে তাদের বেশির ভাগ বহিরাগত বলে দাবি করেছে দুই ছাত্র সংগঠন। এদের পরিচয় উভয়পক্ষের কেউ নিশ্চিত করতে পারেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্যাম্পাস দখলে হামলা-পালটা হামলার ঘটনা ছিল পরিকল্পিত। এ কারণেই এত অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে।
শিবিরের হয়ে ক্যাম্পাস এলাকায় মিছিলে অংশ নিতে দেখা যায় টেরীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল মনসুর, তামাকুমন্ডি লেইন বণিক সমিতির প্রচার সম্পাদক মো. ছাদেক হোছাইন (যার হাতে লাঠি ছিল), সাংগঠনিক সম্পাদক ওমর ফারুক, ক্রীড়া সম্পাদক বোরহান উদ্দিন, নির্বাহী সদস্য নুরুল ইসলাম বিপ্লবসহ শিবিরের বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীদের। ছাত্রদলের হয়েও নিউমার্কেটসহ আশপাশের বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতারা অংশ নেন বলে অভিযোগ করেছে শিবির।
সংঘর্ষের সময় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে পায়ের গোড়ালি প্রায় আলাদা হয়ে যাওয়া আশরাফুল ইসলাম নগরীর ১২নং সরাইপাড়া ওয়ার্ডের শিবিরের সভাপতি বলে জানিয়েছে ছাত্রদল। সে বহিরাগত হয়েও ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের ওপর হামলায় অংশ নিয়েছিল। তবে শিবিরের দাবি, আশরাফুল সরাইপাড়া ওয়ার্ড শিবিরের সভাপতি হলেও তিনি সিটি কলেজের অনার্সের শিক্ষার্থী। আহত হওয়ার পর প্রথমে তাকে নগরীর বেসরকারি একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় বুধবার সন্ধ্যার দিকে তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক সোহেল সিদ্দিক রনি বলেন, দেওয়ালে ‘গুপ্ত’ লেখাকে কেন্দ্র করে শিবির পরিকল্পিতভাবে হামলা করেছে। এতে আমাদের ১৩ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩ জন, আগ্রাবাদ মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালে ৫ জন ও আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালে ৫ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।
অন্যদিকে ছাত্রদলের হামলায় শিবিরের ৩০ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম। আহতদের দেখতে চট্টগ্রামে এসে তিনি এ দাবি করেন।
এদিকে সিটি কলেজে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষের রেশ চট্টগ্রামের অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই শঙ্কায় পুলিশ অন্যান্য ক্যাম্পাসে বাড়তি নজরদারি বাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী।
চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদল ঘটনার প্রতিবাদে বুধবার বিকালে নগরীর স্টেশন রোডে বিক্ষোভ সমাবেশ ও সেখান থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল করে। এখানে এখানে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন। ক্যাম্পাস দখলে মরিয়া শিবির পরিকল্পিতভাবে ছাত্রদল নেতাকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছে বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, গুপ্ত থেকে তারা ক্যাম্পাস দখলে রাখতে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ রাখার নামে নিজেদের রাজনীতির পথ পরিষ্কার রাখতে চায়। কেবল সিটি কলেজ নয়; চট্টগ্রাম কলেজসহ সারা দেশের বিভিন্ন কলেজে তারা এই কৌশল গ্রহণ করেছে। সন্ত্রাসের মাধ্যমে ক্যাম্পাস দখলের রাজনীতি থেকে শিবিরকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে এই নেতা বলেন, অন্যথায় ছাত্রদল সাধারণ ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে ক্যাম্পাসে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতে যা করা দরকার তাই করবে।
অন্যদিকে ডাকসু ভিপি ও ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক আবু সাদিক কায়েম বুধবার চিকিৎসাধীন আহত শিবির কর্মীদের দেখতে যান বেসরকারি পার্কভিউ হাসপাতালে। দুপুরে লালদিঘি পাড়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনারের সঙ্গে দেখা করে হামলায় জড়িতদের গ্রেফতার দাবিতে করে স্মারকলিপি প্রদান করেন। এতে তিনি দাবি করেন, সিটি কলেজ শিবির ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার জন্য ছাত্রদল দায়ী। তারা ক্যাম্পাসকে রক্তাক্ত করছে। ছাত্রদলকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে কিনা-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে এমন প্রশ্ন রেখে সাদিক কায়েম বলেন, ছাত্রদল যদি এভাবে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালায় ক্যাম্পাসে তবে তাদের সেভাবে ডিল করতে শিবিরও প্রস্তুতি নেবে।
দুপুরে সাংবাদিকদের সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, ওই ঘটনায় কোনো পক্ষই লিখিত অভিযোগ বা মামলা দেয়নি। ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলায় জড়িতদের চিহ্নিত ও গ্রেফতারে অভিযান চলছে। তিনি বলেন, নগরীর অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যাতে এই ঘটনার রেশ ছড়িয়ে পড়তে না পারে সে বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
এদিকে, দুপুরে শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সিটি কলেজের অধ্যক্ষ আবু ছালেহ মোহাম্মদ নঈম উদ্দিন বলেন, আমরা মিটিং করেছি শিক্ষকদের নিয়ে। সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কলেজ ক্যাম্পাসে বহিরাগতরা যাতে প্রবেশ করতে না পারে সে ব্যবস্থা নিতে। পুলিশ প্রশাসনের সহায়তা চেয়েছি। উনারা বলেছেন, যতদিন প্রয়োজন হয় তারা আমাদের সহায়তা দেবেন।
এদিকে গতকাল সিটি কলেজে কোনো ক্লাস হয়নি। তবে পরীক্ষা হয়েছে। ক্যাম্পাস অনেকটা ফাঁকা ছিল। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল।