
নিজস্ব প্রতিনিধি: একটি রাজনৈতিক দলকে খুশি করতে সাবেক তিন পুলিশ কর্মকর্তা, সাবেক পিপি ও তার ছেলের বিরুদ্ধে মামলা করেছে সাতক্ষীরার শীর্ষ পর্যায়ের এক চোরাকারবারী।
ওই চোরাকারবারী কোটি টাকা চাঁদার দাবিতে অপহরণ করে নির্যাতনের অভিযোগে সাতক্ষীরা সদর সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মীর্জা সালাহ উদ্দীন, সদর থানার সাবেক ওসি, গোয়েন্দা পুলিশের সাবেক ওসি ও সাবেক পিপিসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে।
সাতক্ষীরার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বিলাস মন্ডলের আদালতে বুধবার মামলাটি দায়ের করেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক নজরুল ইসলামের পোষ্য পুত্র ও দেবহাটা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগের দোসর আল ফেরদাউস আলফা। বিচারক মামলাটি আমলে নিয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) কে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। যার মামলা নং-সিআর ১৭৪২/২৫। ধারা-৪৪৮/৩৬৪/৩২৩/৩০৭সহ অন্যান্য।
এ মামলার আসামীরা হলেন, সাতক্ষীরা সদর সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মীর্জা সালাহ উদ্দীন (৪৫), সদর থানার সাবেক ওসি মোস্তাফিজুর রহমান (৫০), গোয়েন্দা পুলিশের সাবেক ওসি মহিদুল ইসলাম (৪৫), সাবেক পিপি এড. আব্দুল লতিফ (৫৮) ও তার ছেলে মোঃ রাসেল (৩৫)।
মামলার বিবরণীতে জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর দুপুরের দিকে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বাঁকাল চেকপোস্টে বাদীর দেড় কোটি টাকার ভারতীয় সামুদ্রিক মাছ জব্দ করে বিজিবি। পরে বাদীর বৈধ কাগজপত্র বিজিবি’র কাছে পাঠানো হয়। কিন্তু বিজিবি কাগজপত্র যথাযথ বুঝতে না পেরে সেই মাছ সাতক্ষীরা সদর থানায় প্রেরণ করেন। বৈধ কাগজ পাঠালেও মাছ ছাড়া হবেনা, এমন হুমকি দিয়ে সদর থানার তৎকালীন ওসি মোস্তাফিজুর রহমান ফোনে বাদীর কাছে দেড় কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন। একপর্যায়ে বাদী ফোনের সুইস অফ করতে বাধ্য হন।
এরপর ওইদিন মধ্যরাতে সাতক্ষীরা সদর সার্কেলের তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মীর্জা সালাহ উদ্দীন ও ডিবির ওসি মহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে ১০/১২ জন সাদা পোশাকধারী পুলিশ বাদীর পলাশপোলস্থ বাড়িতে গিয়ে ১ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন। সে সময় বাড়িতে থাকা ১৫ লাখ টাকা দিয়েও রক্ষা পাননি তিনি। বাদীর ভাই আরেক চোরাকারবারী আব্দুল আলিম ও বাদীকে ডিবি পুলিশের কার্যালয়ে তুলে নিয়ে পুলিশ ব্যাপক নির্যাতন চালায় বলে মামলায় উল্লেখ করেন তিনি। চাঁদা না দেওয়ায় সাতক্ষীরা সদর থানায় মাছ আটকের ঘটনায় করা মামলায় তাদেরকে অজ্ঞাতনামা আসামী হিসেবে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়।চোরাকারবারী মামলায় আরো উল্লেখ করেন, পরস্পর যোগসাজসে জব্দকৃত দেড় কোটি টাকার মাছ মাত্র ১ লাখ ৯৬ হাজার টাকায় বিক্রি দেখিয়ে বাকী টাকা আত্মসাৎ করেন আসামীরা।
মামলার বিবরণীতে আরও বলা হয়, এ মামলায় জামিন করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বাদীর কাছ থেকে ৩৫ লাখ টাকা চাঁদা নেন সাতক্ষীরা জজ আদালতের তৎকালীন পিপি এড. আব্দুল লতিফ ও তার ছেলে মোঃ রাসেল।
আসামীদের শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারে বাদী তাঁর দৃষ্টিশক্তি প্রায় হারিয়ে ফেলেছেন ও আর্থিক এবং সামাজিকভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। এমতাবস্থায় আরজিতে আদালতের কাছে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেছেন মামলার বাদী শীর্ষ অস্ত্র চোরাকারবারী আল ফেরদাাউস আলফা। তৎকালীন সময়ে মামলার অনুকুল পরিবেশ না থাকায় মামলা করতে বিলম্ব হয়েছে বলে আরজিতে আরো উল্লেখ করা হয়।
এ ব্যাপারে বাদী পক্ষের আইনজীবী এড. খায়রুল বদিউজ্জামান বলেন, এ মামলার পরবর্তী ধার্য দিন নির্ধারিত হয়েছে ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল তারিখে। এছাড়া অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মামলাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সাতক্ষীরার প্রধানকে নির্দেশ দিয়েছেন।
অপরদিকে, শীর্ষ চোরাকারবারী আল ফেরদাাউস আলফা আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মৃত মুনসুর আহমেদের কাছের একজন আস্থাভাজন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। কারণ হিসেবে অনেকেই বলেছেন, আওয়ামী লীগের দোসর চোরাকারবারী আলফা মুনসুর আহমেদের ডোনার হিসেবে কাজ করতেন।
পরবর্তীতে মুনসুর আহমেদের মৃত্যুর পর সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক নজরুল ইসলামের পোষ্য পুত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন সর্বমহলে। আরো বৃদ্ধি হয় তার চোরাচালানীর নেটওয়ার্ক। দিন দিন চোরাকারবারী আল ফেরদাাউস আলফা হয়ে ওঠেন জেলার একজন ক্ষমতাশালী ব্যক্তি হিসেবে। এক পর্যায়ে সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক নজরুল ইসলামের নিজস্ব প্রার্থী হিসেবে চোরাকারবারী আলফা দেবহাটা উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের কিছুদিন পর তিনি গ্রেফতার হন। ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দীর্ঘ এক বছর ৪ মাস অতিবাহিত হওয়ার পর চোরাকারবারী আলফা কেন এ মামলা করলেন এ প্রশ্ন এখন সকলের মূখে মূখে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক রাজনৈতিক নেতা এ প্রতিনিধিকে বলেন, আওয়ামী লীগের দোসর চোরাকারবারী আলফা বর্তমানে তার ভোল পাল্টানোর চেষ্টা করছেন। তার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বর্তমানে একটি রাজনৈতিক দলকে খুশি ও আস্থাভাজন হতেই তিনি এ মামলা করেছেন। ওই রাজনৈতিক নেতা আরো বলেন, আওয়ামী লীগের দোসর চোরাকারবারী আলফা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক নজরুল ইসলামকে বাবাজি বলে ডাকতেন। তার বাবাজিকে খুশি করতে তিনি প্রায়ই ওমরা হজ করাতেন। এমনকি তিনি কি করবেন, কি খাবেন সেটাই আগে থেকে ঠিক করে দিতেন তার বাবাজি।