
কালিগঞ্জ (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ থানায় রবিবার (১২ জুলাই) বেলা দেড়টার দিকে বিকট শব্দে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় এলাকাজুড়ে তীব্র আতঙ্ক ও গভীর সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। থানা চত্বরের মতো একটি সুরক্ষিত স্থানে এ ধরনের বিধ্বংসী বিস্ফোরণ কীভাবে সম্ভব হলো-সেই প্রশ্নের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রশাসনের ভাষ্য।
পুলিশ ঘটনাটিকে ‘পরিত্যক্ত ককটেল’ হিসেবে আখ্যা দিলেও, ভুক্তভোগী রফিকুল ইসলামের যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদ আর সাধারণ মানুষের প্রশ্ন বলছে ভিন্ন কথা।
বিস্ফোরণের পরপরই পুলিশের পক্ষ থেকে দায়সারাভাবে বলা হয়েছে, বিস্ফোরিত ককটেল ‘পরিত্যক্ত’। কিন্তু বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহল পুলিশের এই ব্যাখ্যাকে স্রেফ ‘ইউফেমিসম’ বা ভাষার মারপ্যাঁচ হিসেবে দেখছেন। সাধারণ যুক্তিতে, পরিত্যক্ত বিস্ফোরক অকেজো বা নিষ্ক্রিয় হওয়ার কথা। যদি তা বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়, তবে প্রমাণ হয় ককটেলটি ছিল সম্পূর্ণ সতেজ। প্রশ্ন উঠছে, এই ‘সতেজ’ ককটেল কেন থানায় ছিল এবং কার নির্দেশে বা কোন উদ্দেশ্যে এটি সেখানে রাখা হয়েছিল?
একটি সরকারি থানায় বিস্ফোরকদ্রব্য কীভাবে অনিরাপদ অবস্থায় থাকে-তা নিয়ে অনুসন্ধানে উঠে আসছে তিনটি ভয়াবহ ইঙ্গিত।
প্রথমত, যদি এগুলো মামলার আলামত হয়ে থাকে, তবে বিধি মোতাবেক কেন তা দ্রুত ধ্বংস করা হলো না? দ্বিতীয়ত, অতীতের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ ধরনের বিস্ফোরক ব্যবহার করা হতো প্রতিপক্ষকে ঘায়েল বা মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর জন্য। তবে কি সেই পুরোনো ‘প্র্যাকটিস’ এখনো বহাল? তৃতীয়ত, থানায় এই বিস্ফোরকের উপস্থিতি কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি কোনো গোপন অপতৎপরতার অংশ?
কালিগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন রফিকুল ইসলাম। তার এই পরিস্থিতির দায়ভার কে নেবে? পুলিশ যখন বিষয়টিকে ‘পরিত্যক্ত’ বলে হালকা করে দেখছে, তখন রফিকুল ইসলামের এই যন্ত্রণা যেন অবহেলারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্য এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট করছে যে, ঘটনার গভীরে আরও অনেক কিছু লুকানো আছে।
এ বিষয়ে কালিগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ শহিদুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা জানান, “প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ককটেলটি দীর্ঘদিন ধরে ভবনের ফ্লোরের পাশে মাটির নিচে পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। বিষয়টি অধিকতর তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
প্রশ্ন উঠছে-বিস্ফোরিত ককটেল যদি ‘পরিত্যক্ত’ই হয়, তবে তা বিস্ফোরণ ঘটল কীভাবে? থানার সংরক্ষিত বিস্ফোরকের তালিকা ও নথিপত্রের সাথে এই ঘটনার কী সম্পর্ক?
কালিগঞ্জের সচেতন নাগরিক সমাজ এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয় সংবাদকর্মীরাও প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। সাধারণ মানুষ এখন জানতে চায়, পুলিশের এই ‘ককটেল’ নাটকের নেপথ্যে আসল কুশীলব কারা? থানা এখন আর কেবল আইন রক্ষার কেন্দ্র নয়, বরং জননিরাপত্তার প্রশ্নে এক রহস্যগৃহে পরিণত হয়েছে। প্রশাসন অবিলম্বে এর স্বচ্ছ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে এবং রফিকুল ইসলামের সুচিকিৎসার যথাযথ দায়িত্ব নেবে-এটাই এখন কালিগঞ্জবাসীর দাবি এখন এটাই।
প্রশ্ন থেকে যায়-বিস্ফোরক পদার্থ (যেমন গানপাউডার, কাঁচের টুকরো এবং ফিউজ) যদি দীর্ঘ সময় আর্দ্রতা বা তাপের সংস্পর্শে থাকে, তবে তা অকেজো হওয়ার কথা। কিন্তু যদি সেটি বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়, তবে বুঝতে হবে ককটেলটি সতেজ ছিল। সুতরাং, ‘পরিত্যক্ত’ শব্দটি ব্যবহার করে ঘটনার গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়ার বা দায় এড়ানোর একটি প্রবণতা থাকতে পারে। যা বিস্ফোরিত হয়, তা পরিত্যক্ত হয় কীভাবে? এ প্রশ্ন এখন সবার মূখে।