• আজ- শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১৪ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ
দেবহাটায় ফেসবুকে প্রকাশ্যে উস্কানি দিয়ে মব সৃষ্টি করে হত্যাকাণ্ড: নীরব ভূমিকায় পুলিশ সাতক্ষীরায় আলোচিত জাকারিয়া হত্যা: খুনিদের ফাঁসির দাবিতে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে কথিত তৌহিদী জনতার নেতার ইন্ধনে মব সৃষ্টি: যুবকের মৃত্যু সাতক্ষীরায় ট্রান্সফর্মার চুরি করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মৃত্যু জিয়া বাহিনীর হাতে ২ জেলে অপহরণ: সুন্দরবনে আবারো মুক্তিপন দাবি সাবেক এমপি, বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম এড. এন্তাজ আলীর স্ত্রী ও অপরাধ বার্তার প্রকাশক সুজয়ের মায়ের মৃত্যু, দাফন সম্পন্ন: শোক জ্ঞাপন গুড় পুকুর মেলা থেকে প্রতিদিন ১৩ লাখ টাকা আদায়: নীরব প্রশাসন শ্যামনগরে মাদরাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ: ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা সাতক্ষীরায় জাকারিয়া হত্যা মামলার আরেক আসামী সাগর গ্রেপ্তার কালিগঞ্জে পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধ: ভিআইপি ফ্যাশনের মালামাল নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

দেবহাটায় ফেসবুকে প্রকাশ্যে উস্কানি দিয়ে মব সৃষ্টি করে হত্যাকাণ্ড: নীরব ভূমিকায় পুলিশ

রিপোর্টার: / ১৪ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অজুহাতে ফেসবুক লাইভ ও পোস্টের মাধ্যমে উস্কানি ছড়িয়ে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটার পরও মূল প্ররোচনাকারী ফজলুল হজ আমিনী প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে জানা গেছে। ফেসবুকে ভিডিও বার্তা দিয়ে উন্মত্ত জনতা জড়ো করা, হাসপাতাল থেকে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিকে ছিনিয়ে নিয়ে দেয়ালে আছাড় মারা ও পিটিয়ে হত্যার মতো বর্বরোচিত অপরাধের দায় নিজ মুখে স্বীকার করার পরও তাকে দ্রুত গ্রেপ্তার না করায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা।
‘মব জাস্টিস’-এর মূল কারিগর ফজলুল হক আমিনী ও তার প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ
সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন অডিও-ভিডিও ও পোস্টের তথ্যানুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করেন ফজলুল হক আমিনী।
 উস্কানি ও স্বীকারোক্তি
তিনি নিজেই বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে স্পষ্ট স্বীকার করেছেন যে, তিনি ফেসবুক লাইভ ও পোস্ট দিয়ে ‘তৌহিদী জনতা’কে জড়ো হওয়ার নির্দেশ দেন এবং উস্কানি ছড়িয়ে মানুষকে উত্তেজিত করেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ
অডিও বার্তায় প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করতে দেখা গেছে—প্রশাসন তাকে গ্রেপ্তার করলে করবে এবং এর পরিণামে তার জেল-জুলুম বা ফাঁসি হলেও কোনো পরোয়া নেই। এমন প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ও উস্কানির পরেও তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কঠোর আইনি ব্যবস্থা দৃশ্যমান না হওয়ায় সামাজিক মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
উস্কানিদাতার প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো নিয়ে সুশীল সমাজ ও নেটিজেনদের ক্ষোভ
 ফজলুল হক আমিনীর ফেসবুক পোস্টেৎসামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষ কড়া ভাষায় এই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সমালোচনা করছেন: নেটিজেনদের বড় একটি অংশ মন্তব্য করছেন যে, ফেসবুক লাইভ ও পোস্টের সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে যেখানে মূল উস্কানিদাতাকে প্রথম সুযোগেই গ্রেপ্তার করার কথা, সেখানে সে কীভাবে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায় ও বড় বড় কথা বলে?

 

 এছাড়া রাষ্ট্রীয় ও আইনি কাঠামোর চরম ব্যর্থতা
একজন মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষকে হাসপাতাল থেকে বের করে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো, আর যে লোক মাইকিং বা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে এই রক্তক্ষয়ী মব সৃষ্টি করল, সে এখনও আইনের আওতার বাইরে থাকা মানে দেশে ‘মব কালচার’কে প্রশ্রয় দেওয়া।
নিহতের বড় ভাই আব্দুল জলিল জানান, সোমবার সন্ধ্যায় স্ত্রীর সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন ধরনের গালিগালাজ করেন মানসিক রোগাক্রান্ত ওয়াহিদুজ্জামান। এ সময় স্থানীয় এক ব্যক্তি অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। ওই অডিওতে কটূক্তি সংক্রান্ত কথা রয়েছে দাবি করে দেবহাটার ফজলুল হক আমিনী ওয়াহিদুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে ফেসবুকে লাইভ করে জনতাকে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান। এরপর ক্ষুব্ধ জনতা ওয়াহিদুজ্জামানের বাড়ির গেট ভাঙচুর করে সুবর্ণাবাদ বাজারে নিয়ে মারধর করে। মঙ্গলবার রাতে ফজলুল হক আমিনীসহ বিক্ষুব্ধরা চিকিৎসাধীন শামীমকে চেম্বার থেকে বের করে গণপিটুনি দেন। খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সখীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। এরপর ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে এক হাজারের বেশি লোক সখীপুর হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাধীন ওয়াহিদুজ্জামানকে দেয়ালে আছাড় মারে এবং বাইরে এনে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে ফেলে রেখে চলে যায়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। মব সৃষ্টির মাধ্যমে আইন হাতে তুলে নিয়ে তার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন আব্দুল জলিল।
নিহতের ছোট ভাই জেলা রেফারি অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ও সুবর্ণাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি তাহসিভ রহমান সাগর জানান, বুধবার রাতে এশার নামাজের পর শামীমের জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। তাঁর দুটি ছেলে রয়েছে। বড় ছেলের বয়স ১২ বছর, ছোট ছেলের বয়স ৭ থেকে ৮ মাস। আজকে মামলা করবো।
ফজলুল হক আমিনী জানান, শামীম তার প্রতিবেশীদের সাথে কথাবার্তার মাধ্যমে অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে বিভিন্ন অবমাননাকর মন্তব্য করেছে এবং প্রতিবেশীদের কাছে এই সংক্রান্ত ভিডিও রেকর্ড বা প্রমাণ রয়েছে।
ওই যুবকের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, কোনো পাগল ব্যক্তি শুধু আল্লাহ, রাসূল, কোরআন, হাদিস, সাহাবি এবং ওলামায়ে কেরামকে নিয়ে সুনির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক কথা বলে না। পাগলের লক্ষণ থাকলে সে অন্যান্য বিষয় নিয়েও কথা বলত, কিন্তু তার বক্তব্যে শুধুমাত্র ইসলাম ও কোরআন-হাদিসের বিরুদ্ধে কথা বলায় এটি কোনো পাগলের লক্ষণ হতে পারে না বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও বলেন যে, ইসলাম ধর্ম, কোরআন বা রাসূলকে নিয়ে কেউ কটুক্তি বা অবমাননা করলে তা আইনের দৃষ্টিতে যেমন অপরাধ, তেমনি শরীয়তের দৃষ্টিতেও এর বিচার হওয়া উচিত। ধর্ম নিয়ে ওয়াহিদুজ্জামান দীর্ঘ ছয় মাস ধরে আপত্তিকর মন্তব্য করে আসছিল। ‘তৌহিদী জনতা’ গণপিটুনি দিয়ে তাকে পৃথিবী থেকে বিদায় করেছে।
নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে গিয়ে তিনি জানান যে, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত নন, তবে কোরআন ও রাসূলকে নিয়ে কেউ বিরূপ মন্তব্য করলে তার প্রতিবাদ করাকে তিনি নিজের ঈমানী দায়িত্ব মনে করেন। তিনি ফেসবুক এবং লাইভে স্ট্যাটাস দিয়ে মানুষ জড়ো করার বিষয়টির পাশাপাশি নিজের এই অবস্থানের কথা স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন। এই বিষয়ে প্রশাসন বা অন্য কেউ তাকে ধরলে তার জন্য তিনি সম্পূর্ণ প্রস্তুত আছেন এবং বাজারে এসে প্রশাসনের অপেক্ষায় করছেন, এমনকি এর পরিণামে তার ফাঁসি বা জেল-জুলুম হলেও তার কোনো আপত্তি নেই বলে উল্লেখ করেন।
তিনি নিজের পেশাগত পরিচয় ও সামাজিক কাজের কথা উল্লেখ করে বলেন যে তিনি পারুলিয়া বাজারের গরু-ছাগল জবাইয়ের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মোটরসাইকেল চালক সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন মসজিদে ইমামের দায়িত্বে থাকার পাশাপাশি বর্তমানে কোনো ইমাম অসুস্থ হলে তার প্রক্সি বা সহযোগিতায় এগিয়ে যান বলে তিনি জানান।
পরিশেষে তিনি বলেন, ইসলাম ও রাসূলের অবমাননার মতো ঘটনায় যারা কটুক্তি বা বিরূপ মন্তব্য করে, তাদের বক্তব্য আগে সম্পূর্ণ শোনা উচিত এবং ইসলামবিরোধী এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তার অবস্থান ও ক্ষোভ সবসময় অব্যাহত থাকবে।
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন জানান, এখন পর্যন্ত ওই ঘটনায় পরিবার থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে সকালে ফোন দিয়েছে এবং তারা থানায় এসে মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন।
 তিনি আরো বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (ফেইসবুক) ফজলুল হক আমিনীর লাইভ ও স্ট্যাটাসের বিষয়টি পুলিশের নজরে এসেছে।
 এ বিষয়ে পুলিশ একটি ছায়া তদন্ত শুরু করেছে এবং এর সাথে কারা কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখতে সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করে বিস্তারিত অ্যানালাইসিস করা হচ্ছে।
হাসপাতাল ও আশেপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ এবং ছড়িয়ে পড়া সামাজিক মাধ্যমের ভিডিও বিশ্লেষণ করে জড়িতদের সনাক্ত করা হচ্ছে এবং শীঘ্রই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
মানবাধিকার কর্মী ও সাধারণ জনগণের মতে, কোনো দেশে যদি ডিজিটাল মাধ্যমে উস্কানি দিয়ে মানুষ হত্যা করার পর অভিযুক্ত ব্যক্তি এভাবে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতে পারে, তবে তা সমাজের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি। উস্কানিদাতা ফজলুল হক আমিনীসহ এ ঘটনার মূল হোতাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় না আনলে আইনের শাসনের ওপর মানুষের আস্থা বজায় রাখা কঠিন হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অন্যান্য লেখা সমূহ