
নিজস্ব প্রতিনিধি: সড়কের কোথাও খুঁড়ে রাখা হয়েছে , আবার কোথাও বড় বড় খানাখন্দে জমে আছে কাদা ও পানি। সাতক্ষীরা-ভেটখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের শ্যামনগর ও কালিগঞ্জ অংশে এমন পরিস্থিতিতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, পথচারী এবং যানবাহন চালকরা। উন্নয়নকাজের নামে দীর্ঘ সংস্কারের এ প্রক্রিয়া চলাচলে দূর্ভোগে পড়েছে জেলাবাসী।
সরেজমিনে দেখা যায়, মহাসড়কটির শ্যামনগর ও কালিগঞ্জ উপজেলা অংশের বিভিন্ন জায়গায় উন্নয়নকাজ চলছে ধীরগতিতে। কোথাও সড়ক খুঁড়ে রাখা হয়েছে, কোথাও আবার খানাখন্দে জমেছে কাদাপানি। এতে পিচ্ছিল সড়কে যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কের গর্ত ও কাদায় মাঝারি ও হালকা যানবাহন প্রায়ই আটকে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও যানবাহন উল্টে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। সম্প্রতি একটি ইজিবাইক গর্তে আটকে উল্টে যাওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে বলে স্থানীয়রা জানান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতার কারণে সংস্কারকাজ নির্ধারিত সময়ে এগোচ্ছে না। এতে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে যাওয়া রোগী, শিক্ষার্থী ও প্রতিদিনের যাত্রীদের চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসচালক আব্দুর রউফ বলেন, “এই রাস্তায় গাড়ি চালানো মানেই জীবন বাজি রাখা। প্রতিদিন কোনো না কোনো গাড়ি কাদায় আটকে যাচ্ছে বা উল্টে দুর্ঘটনা ঘটছে। গাড়ি মেরামতের খরচ চালাতে গিয়ে লাভ তো দূরের কথা, পকেটের টাকা গচ্চা যাচ্ছে। দ্রুত এ রাস্তা ঠিক করা না হলে গাড়ি চালানো বন্ধ দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।”
শ্যামনগরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “রাস্তার যে অবস্থা, সুস্থ মানুষও এতে যাতায়াত করলে অসুস্থ হয়ে পড়বে। আশঙ্কাজনক কোনো রোগীকে এভাবে হাসপাতালে নেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়ক সংস্কারের নামে আমাদের এভাবে জিম্মি করে রাখার কোনো মানে হয় না।”
দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
কালিগঞ্জের স্থানীয় ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর হোসেন ও সাইফুল ইসলাম বলেন, “সড়কটি এত গুরুত্বপূর্ণ একটি যোগাযোগমাধ্যম, অথচ এটি এখন চরম অবহেলিত। সংশ্লিষ্ট সড়ক বিভাগ ও প্রশাসনের অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করা উচিত। ঠিকাদারকে জবাবদিহিতার আওতায় এনে দ্রুত সড়কটি চলাচলের উপযোগী না করলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের শেষ থাকবে না।”
স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীদের দাবি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ যথাযথভাবে তদারকি করে দ্রুত সংস্কারকাজ শেষ করতে হবে। পাশাপাশি সড়কটি নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচলের উপযোগী করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সাতক্ষীরা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরা থেকে ভেটখালী পর্যন্ত আঞ্চলিক মহাসড়কটির দৈর্ঘ্য ৬২ কিলোমিটার। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সড়কটি আগে থেকেই বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দে ভরা ছিল।
এই পরিস্থিতিতে মহাসড়কটির নির্মাণ ও সংস্কারকাজের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পটির জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৮২২ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের অক্টোবরে কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চলতি বছরের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা শেষ হয়নি।
৬২ কিলোমিটার সড়কের কাজ পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি ছিল প্রায় ৩১ থেকে ৩২ শতাংশ। সংস্কারকাজের জন্য কোথাও কোথাও সড়ক কেটে রাখার পর বৃষ্টির পানিতে সেখানে কাদা ও পানি জমে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
নির্মাণকাজে নিয়োজিত এমডি মাঈনুদ্দীন লিমিটেডের প্রকল্প পরিচালক রবিউল ইসলাম অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমরা যখন কোনো সামগ্রী আনি, তখন সেটার উৎস অনুমোদন থাকে। এ ছাড়া নির্মাণসামগ্রীগুলো টেস্ট করে আনা হয়। অনিয়ম করার কোনো সুযোগ নেই।”
মহাসড়কটির নির্মাণকাজ নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার পারভেজ।
তিনি জানান, বিভিন্ন জটিলতার কারণে ২০২৫ সালের অক্টোবরে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্রকল্পের মেয়াদ ছিল দুই বছর ১১ মাস। তবে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় প্রায় দুই বছর সময় নষ্ট হয়েছে। এরপরও কাজের অগ্রগতি ৩২ শতাংশে পৌঁছেছে।
তিনি আরও বলেন, বৈদ্যুতিক খুঁটির কারণে ২ ও ৩ নম্বর প্যাকেজের কাজের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চলতি বছরের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। তবে ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে পুরো কাজ শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের এই কর্মকর্তা জানান, নির্মাণকাজ নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের বেহাল সড়ক এবং চলমান নির্মাণকাজের কারণে তৈরি হওয়া জনদুর্ভোগ দ্রুত কমাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন সাতক্ষীরা-ভেটখালী মহাসড়ক ব্যবহারকারী স্থানীয় বাসিন্দা ও যানবাহন চালকরা।