
নিজস্ব প্রতিনিধি: সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর-কালীগঞ্জ আংশিক) আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতা গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটি প্রকাশের পর সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের মিডিয়া সেল-সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্ম ‘ক্রাইম বার্তা’র পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা। পরে একই কক্ষের আরও ভিডিও সামনে আসলে ভিডিওতে দেখা যাওয়া তরুণীকে এমপির স্ত্রী দাবি করেছেন জামায়াতের স্থানীয় নেতারা।
জামায়াতের সেক্রেটারি ও দলটির মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা মাওলানা আজিজুর রহমান মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সকালে জানান, ‘ভিডিওটি আমাদের নজরে এসেছে। এমপি সাহেব আমাদের জানিয়েছেন, ভিডিওতে যাকে দেখা যাচ্ছে তিনি তার দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীর সম্মতিক্রমেই এ বিয়ে হয়েছে।’
সোমবার (২০ জুলাই) রাত থেকে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও সিসিটিভি ফুটেজে এক তরুণীর সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামকে একটি কক্ষে অবস্থান করতে দেখা যায়। ফুটেজের বিভিন্ন অংশে তাকে কখনো মোবাইল ফোনে কথা বলতে, আবার কখনো ওই নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যায়।
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের মিডিয়া সেল-সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্ম ‘ক্রাইম বার্তা’র পক্ষ থেকে কয়েকটি পোস্ট দিয়ে দাবি করা হয়, এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা একটি ভুয়া ভিডিও।
তবে তথ্য যাচাইকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বলছে, ভিডিওটিতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার বা ডিজিটাল ম্যানিপুলেশনের কোনো সুস্পষ্ট আলামত পাওয়া যায়নি। এআই ভিডিওর কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে, এই ভিডিওগুলোতে সেসব নেই। এটি একটি বাস্তব ভিডিও বলে প্রাথমিক বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয়েছে।
সিসিটিভি ফুটেজে থাকা টাইমস্ট্যাম্প অনুযায়ী ভিডিওটি ২০২৩ সালের ১০ জুলাই ধারণ করা হয়েছিল। তবে ঘটনাস্থল সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ভিডিওটি নিয়ে বক্তব্য জানতে গাজী নজরুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিষয়টি নিয়ে এ প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলেছেন সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও দলটির মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা মাওলানা আজিজুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘এমপি সাহেব আমাদের জানিয়েছেন, ভিডিওতে যাকে দেখা যাচ্ছে তিনি তার দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীর সম্মতিক্রমেই এ বিয়ে হয়েছে। তবে ভিডিওটি কীভাবে এবং কার মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে, সে বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি।’
দ্বিতীয় বিয়ে কবে হয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিয়ের সুনির্দিষ্ট তারিখ আমার জানা নেই। তবে বেশ কিছুদিন আগে বিয়েটি সম্পন্ন হয়েছে বলে আমরা জেনেছি।
ভিডিওতে দেখা যাওয়া তরুণীর বয়স বেশ কম মনে হয়েছে। তবে ওই তরুণীর একটি বায়োডাটা এসেছে। সেখানে দেওয়া তার জন্মতারিখ অনুযায়ী এখন বয়স হওয়ার কথা ১৮ বছর ২ মাস। মেয়েটির প্রাইভেসি রক্ষায় এই প্রতিবেদনে তার নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট এমপির ‘জোর সুপারিশ’ করা ওই বায়োডাটায় মেয়েটি নিজেকে অবিবাহিত বলে উল্লেখ করেছেন।
২০২৬ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে তিনি এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। তার ফোন এবং হোয়াটসঅ্যাপ বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে হোয়াটসঅ্যাপের ছবি দেখে বোঝা গেছে, তার পরিবারও জামায়াত ইসলামের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ছবিতে জামায়াতের ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে থাকা পরিবারের এক সদস্যের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।
অপরদিকে, সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর-কালীগঞ্জ আংশিক) আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতা গাজী নজরুল ইসলাম পরবর্তীতে তিনি নিজেই জানিয়েছেন, ভাইরাল ভিডিওটি মগবাজারে একটি অফিসের । লিখিত বিবৃতিতে তিনি দাবি করেছেন, মরিয়ম বেগম নামের ১৮ বছরের ওই তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী।
লিখিত বিবৃতিতে নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঘটনাটি গত ১৩ জুলাই ২০২৬ তারিখের এবং এর পেছনে তার নিজ গাড়িচালকের পরিকল্পিত ব্ল্যাকমেইলিং ও চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
লিখিত বিবৃতিতে গাজী নজরুল ইসলাম জানান, গত ১৩ জুলাই তিনি তার প্রথম স্ত্রী মোসাম্মৎ মাকছুদা বেগম, দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম এবং গাড়িচালক ওবায়দুল্লাহকে নিয়ে দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা মো. মাসুম বিল্লাহর মগবাজারের ব্যবসায়িক কার্যালয়ে যান। সেখানে তারা প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা অবস্থান করেন। অবস্থানকালীন সময়ে চালক ওবায়দুল্লাহ সুকৌশলে ৬-৭ জন অপরিচিত ব্যক্তিকে ওই কার্যালয়ে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই অপরিচিত ব্যক্তিরা কক্ষে ঢুকে এমপি ও তার পরিবারের সদস্যদের পরিচয় জানতে চেয়ে হেনস্তা শুরু করে। একপর্যায়ে তাদের নিচে একটি চায়ের দোকানে নিয়ে গিয়ে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে কিছু টাকা প্রদান করার পর তারা সেখান থেকে মুক্তি পান।
ব্ল্যাকমেইল ও সিসিটিভি ফুটেজের অপব্যবহারের অভিযোগ: ঘটনার পর গাজী নজরুল ইসলাম জানতে পারেন যে, এই পুরো পরিস্থিতির মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন তার গাড়িচালক ওবায়দুল্লাহ। যিনি সম্পর্কে দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা।
মাসুম বিল্লাহর সঙ্গে ওবায়দুল্লাহর দুলাভাইয়ের পূর্বশত্রুতা ছিল। ঘটনার দিন রাত ১০টার দিকে ওবায়দুল্লাহ এমপির কাছে ৫ লাখ টাকা এবং মাসুম বিল্লাহর কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তিনি সিসিটিভি ফুটেজ ব্যবহার করে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার ও পরিবারের ক্ষতি করার হুমকি দেন।
দাবিকৃত টাকা না পেয়ে চালক ওবায়দুল্লাহ অফিসের সিসিটিভি ফুটেজ ব্যবহার করে একটি বিভ্রান্তিকর ও কুরুচিপূর্ণ ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। সংসদ সদস্য একে তার এবং স্ত্রীর বিরুদ্ধে একটি গভীর ষড়যন্ত্র ও ‘চরিত্র হননের অপচেষ্টা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
গাজী নজরুল ইসলাম এই হীন কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, এটি সম্পূর্ণ একটি সাজানো ঘটনা। তিনি এই ষড়যন্ত্রের মূল হোতা চালক ওবায়দুল্লাহসহ জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
তথ্য ও সূত্র: দৈনিক কালবেলা