
দেবহাটা (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি: স্বামীর মৃত্যুর পর ওয়ারেশকাম সার্টিফিকেটের জন্য প্রায় ১০ মাস ঘুরেও না পেয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন বৃদ্ধা ছকিনা খাতুন (৮১)। ঘটনাটি ঘটেছে সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার নওয়াপাড়া ইউনিয়নে। অসহায় বৃদ্ধা ছকিনা খাতুন একই এলাকার মৃত আক্কাজ আলী মোল্লার দ্বিতীয় স্ত্রী।
ওই বৃদ্ধার ছেলে জানায়, অসহায় ছকিনা খাতুনের নিজস্ব কাজে ওয়ারেশকাম সার্টিফিকেট প্রয়োজন হলে তিনি ইউনিয়ন পরিষদে আবেদন করেন। কিন্তু তাকে ওয়ারেশকাম না দিয়ে বিভিন্ন ভাবে তালবাহানা করেন দেবহাটার নওয়াপাড়া ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোনায়েম হোসেন।
এ ঘটনায় বৃদ্ধা ছকিনা খাতুনের ছেলে আমজাদ হোসেন কয়েকবার দেবহাটা উপজেলা নিবার্হী অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তারপরও দূর্ণীতিবাজ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোনায়েম হোসেন ওই বৃদ্ধার ওয়ারেশকাম সার্টিফিকেট দেয়নি।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, দেবহাটা উপজেলার নওয়াপাড়া গ্রামের সাবেক ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মৃত আক্কাজ আলী মোল্লা দ্বিতীয় বিয়ে করেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর গ্রামের মতিয়ার মোড়লের মেয়ে সকিনা খাতুনকে। ওই সময় সকিনা খাতুন আক্কাজ আলী মোল্লার দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে স্বামীর বাড়িতেই বসবাস করতেন।
এদিকে, আক্কাজ আলী মোল্লার প্রথম স্ত্রীর সাত ছেলে এবং দ্বিতীয় স্ত্রী সকিনা খাতুনের চার ছেলে। মোট ১১ জন ছেলে সন্তান আক্কাজ আলীর।
অপরদিকে, ১৯৯৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর চাকরি করাকালীন সময় আক্কাজ আলী মোল্লা মৃত্যুবরণ করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর প্রথম স্ত্রী দ্বিতীয় স্ত্রী ছকিনা খাতুনকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন শুরু করে। নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে ছকিনা খাতুন সাতক্ষীরা সদরের ধুলিহরে পিতার বাড়িতে বসবাস শুরু করেন এবং মাঝেমধ্যে নওয়াপাড়ায় স্বামীর বাড়িতে যেয়ে বসবাস করতেন।
একপর্যায়ে প্রথম স্ত্রী ও তার ছেলেরা দ্বিতীয় স্ত্রী ছকিনা খাতুনকে স্বামীর সম্পত্তির অংশ থেকে বঞ্চিত করতে ষড়যন্ত্র শুরু করেন।
নওয়াপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৯নং ওয়ার্ডের সদস্য মনিরুল ইসলামের কাছে ওয়ারেশকাম সার্টিফিকেট নিতে গেলে তিনি দিলেও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোনায়েম হোসেন আর্থিক সুবিধা নিয়ে তা না দিয়ে প্রায় ১০ মাস বিভিন্নভাবে তালবাহানা করে হয়রানি করেন।
এক পর্যায়ে দ্বিতীয় স্ত্রী ছকিনা খাতুন স্বামী আক্কাজ আলী মোল্লাকে তালাক দিয়েছে মর্মে ১৯৯৭ সালের একটি ভূয়া এভিডেফিটের ঘোষণাপত্র দেখায় এবং ওয়ারেশকাম সার্টিফিকেট দেওয়া হবে না বলে জানিয়ে দেয় ওই দূর্ণীতিবাজ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোনায়েম হোসেন (যদিও ওই চেয়ারম্যান গত ২০২৫ সালের জানুয়ারী মাসে একটি সঠিক ওয়ারেশকাম সার্টিফিকেট প্রদান করেছিলেন)।
ঘটনার পর ছকিনা খাতুনের ছেলে আমজাদ হোসেন গত ২৮ জুলাই উপজেলা নিবার্হী অফিসার বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগের প্রেক্ষিতে তৎকালীন ইউএনও মোঃ আসাদুজ্জামান যাচাইপূর্বক জরুরি ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিলেও দূর্ণীতিবাজ চেয়ারম্যান মোনায়েম হোসেন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
গত বছরের ১৯ আগস্ট তৎকালীন দেবহাটা উপজেলা নিবার্হী অফিসার কেএম আবু নওশাদের সাথে ভুক্তভোগী যোগাযোগ করলে তিনি উভয় পক্ষকে ডেকে আলোচনার মাধ্যমে ওয়ারেশকাম সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্য ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোনায়েম হোসেনকে নির্দেশ দেন।
কিন্তু ইউএনও’র নির্দেশ না মেনে পরবর্তীতে দূর্ণীতিবাজ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোনায়েম হোসেন আদালতে একটি সাকসেশন সার্টিফিকেট প্রাপনের দরখাস্ত করা আছে, অতএব কোন ওয়ারেশকাম সার্টিফিকেট দেবে না বলে জানিয়ে দেন।
এব্যাপারে অসহায় বৃদ্ধা ছকিনা খাতুন বলেন, আমার স্বামী আক্কাজ আলী মোল্ল্যা মৃত্যুবরণ করেন ১৯৯৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ১৯৯৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি যে এফিডেফিট দেখাচ্ছে তা আমার করা না। আমি কখনও কোর্টে যাইনি। ওটা ভূয়া ও জাল। স্বামীর সম্পত্তি থেকে আমাকে বঞ্চিত করতে জালিয়াতির মাধ্যমে ভূয়া এভিডেফিট করা হয়েছে। গত ১০ আগস্ট জীবনে প্রথম কোর্টে গিয়ে আমি একটি সঠিক এভিডেফিট করেছি। তাছাড়া স্বামীর মৃত্যুর পর কোন স্ত্রী স্বামীকে তালাক দিতে পারে? ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোনায়েম হোসেন আমার সতিনের সন্তান মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আলমগীর হোসেনের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে দূর্ণীতির আশ্রয় নিয়ে যা পূর্বপরিকল্পিত ভাবে আমাকে ওয়ারেশকাম সার্টিফিকেট থেকে বঞ্চিত করেছে।
ওই বৃদ্ধার ছেলে আমজাদ হোসেন জানায়, আলমগীর হোসেন একজন উপসচিব হওয়ায় তার প্রভাব খাঁটিয়ে দূর্ণীতিবাজ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে দিয়ে আমার মাকে হয়রানি করছে বলে তিনি জানান। তবে এব্যাপারে আমরা একটি মামলা করবো।
স্থানীয়রা জানান, উপসচিব আলমগীর হোসেন আওয়ামী পরিবারের একজন সন্তান। তার একটি ভাই আফসার আলী (বাবলু) কুষ্টিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইবারের সাবেক ভিপি, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন ও সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক বিষয়ক সম্পাদক।
আরেক ভাই মনিরুজ্জামান মনি দেবহাটার নওয়াপাড়া ইউপি’র ৯নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি।
এব্যাপারে নওয়াপাড়া ইউপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোনায়েম হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আদালতে সাকসেশন মামলার রায় থাকায় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ওয়ারেশকাম সার্টিফিকেট দেওয়া সম্ভব হয়নি।
ওই বৃদ্ধার সতিনের ছেলে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আলমগীর হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অস্বীকার করে বলেন, এসব ব্যাপারে আমার কোন হাত নেই। আমি কিছুই বলতে পারি না।