• আজ- রবিবার, ২৪ মে ২০২৬, ০১:৪১ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ
কালিগঞ্জে সড়ক দখলে বালুর সিন্ডিকেট, ১০ চাকার ট্রাকে বেপরোয়া বালু বাণিজ্যে জনদুর্ভোগ চরমে: নীরব ভূমিকায় প্রশাসন ভাঙছে বাঁধ, বাড়ছে লবণাক্ততা, তবু বাজেটে কমছে জলবায়ুর হিস্যা: বিশেষ বরাদ্দের দাবী পরিবেশবাদীদের সত্য ও সাহসের আলোকযাত্রায় ১১ বছরে দক্ষিণের মশাল পলাশপোল সমাজ উন্নয়ন সংস্থার কমিটি: সভাপতি মুকুল, সম্পাদক জাহিদুল, সাংগঠনিক মাসুদ দেবহাটায় গ্রাম আদালত বিষয়ক জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন কর্মশালা পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে কালিগঞ্জের কুশুলিয়ায় ৬৪৯ পরিবারের মাঝে চাল বিতরণ যশোরে কাভার্ডভ্যান-ইজিবাইক-ভ্যানের ত্রিমুখী সংঘর্ষ, নিহত ৪ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে লিগ্যাল নোটিশ হাম ও উপসর্গে মৃত্যু ছাড়াল ৫০০ মেসি বিশ্বকাপে খেলছেন, জানালেন কোচ

ভাঙছে বাঁধ, বাড়ছে লবণাক্ততা, তবু বাজেটে কমছে জলবায়ুর হিস্যা: বিশেষ বরাদ্দের দাবী পরিবেশবাদীদের

রিপোর্টার: / ১৮ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬
????????????

নিজস্ব প্রতিনিধি: প্রতিনিয়ত বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উপকূলীয় জেলাগুলোতে ঢুকছে লবণাক্ত পানি। নষ্ট হচ্ছে মাটির উর্বরতা, সুপেয় পানির তীব্র সংকটে বিপর্যস্ত সাধারণ মানুষের জীবন। উপর্যুপরি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসে একের পর এক ভেঙে যাচ্ছে বেড়িবাঁধ। জলবায়ু পরিবর্তনের এমন ভয়াল বাস্তবতায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের মানুষ এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছেন। এই পরিস্থিতি থেকে উপকূলকে বাঁচাতে আগামী জাতীয় বাজেটে সুনির্দিষ্ট ও বিশেষ বরাদ্দের জোর দাবি জানানো হয়েছে।

শনিবার সকাল ১১টায় সাতক্ষীরা শহরের একটি (পানসী) রেস্টুরেন্টে উপকুলের পরিবেশ সংকট নিরসনে জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের দাবীতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পরিবেশবাদীরা এ দাবি জানান। পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরাম’- সাতক্ষীরা জেলা শাখা এসংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘লোকাল এনভায়রনমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল রিসার্চ সোসাইটি’ (লিডার্স) এই ফোরামের সচিবালয় হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে।

সংবাদ সম্মেলনে সাতক্ষীরা সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর আব্দুল হামিদের সভাপতিত্বে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন, ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মাধব চন্দ্র দত্ত। সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল কাশেম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম কামরুজ্জামান, আমিনা বিলকিস ময়না, এসএম শহীদুল ইসলাম, শেখ তানজির আহমেদ, আকরামুল ইসলাম, আসাদুজ্জামান সরদার, মোঃ হোসেন আলী, মিলন বিশ্বাস, শেখ সিদ্দিকুর রহমান এবং ভূমিহীন নেতা আব্দুস সামাদসহ সুশীল সমাজ, পরিবেশকর্মী ও যুবসমাজের প্রতিনিধিরা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন, সাংবাদিক শরীফুল্লাহ কায়সার সুমন।

সংবাদ সম্মেলনে বৈশ্বিক বিভিন্ন গবেষণা ও সূচক উল্লেখ করে জানানো হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক অভিঘাতে বাংলাদেশ এখন খাদের কিনারায়। লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘ম্যাপলক্রাফট’-এর জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বের ১৭০টি দেশের মধ্যে জলবায়ু সংকটে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ১৬টি দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। একইভাবে, ‘ওয়ার্ল্ড রিস্ক ইনডেক্স ২০২৩’ অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী ঝুঁকির দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান নবম। জার্মানওয়াচ-এর ‘জলবায়ু ঝুঁকি সূচক ২০২৫’ বলছে, দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা দেশের তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে ১৩তম অবস্থানে।

বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, ২০৫০ সালের মধ্যে সমদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের প্রায় ১৭ শতাংশ ভূখন্ড সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যার ফলে দেশের ৩০ শতাংশ কৃষিজমি হারিয়ে যাবে। এর চেয়েও বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে শতকের শেষে। ২১০০ সালের মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলসহ দেশের প্রায় ৪৩৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। এর ফলে প্রায় ১০ মিলিয়ন (১ কোটি) মানুষ নিজেদের ভিটেমাটি হারিয়ে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবেন।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, বিগত ২০ বছরে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে একের পর এক শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে। এতে যেমন প্রাণহানি ঘটেছে, তেমনি অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়েছে উপকূলের মানুষ।

২০০৭ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ১১,৫৬০ কোটি টাকা। এর মাত্র দুই বছর পর ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলা খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে ব্যাপক তান্ডব চালিয়ে ১৮৮৫ কোটি টাকার ক্ষতি করে, যা এই অঞ্চলের মানুষকে দীর্ঘ সময় লোনা পানির মধ্যে আটকে রাখে। এরপর ২০১৯ সালে পরপর দুটি দুর্যোগ ফণী ও বুলবুলের কারণে যথাক্রমে ৫৩৬ কোটি ও ২৬৩ কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। ২০২০ সালে করোনা মহামারির চরম সংকটের মধ্যে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় আম্পান। খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী ও সাতক্ষীরাসহ ১৭টি জেলায় এর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১১০০ কোটি টাকা।

ক্ষয়ক্ষতির এই ধারা এখানেই থেমে থাকেনি। ২০২১ সালে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস ৩০০ কোটি টাকা, ২০২২ সালে সিত্রাং ৪১৪ কোটি টাকা এবং ২০২৩ সালে মিধিলি প্রায় ২০০ কোটি টাকার ক্ষতিসাধন করে। আর সর্বশেষ ২০২৪ সালের মে মাসে পশ্চিম উপকূলে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় রেমাল, যা ৬৮৮০ কোটি টাকার বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতি রেখে যায়, যার ক্ষত উপকূলবাসী এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন।

পরিবেশকর্মীরা জানান, এই বিপুল আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি মানুষের মৃত্যু, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি, বসতভিটা ধ্বংস এবং তীব্র মানসিক চাপের মতো বিশাল ‘অর্থনৈতিক ক্ষতি’ উপকূলবাসীকে প্রতিদিন সইতে হচ্ছে। কর্মসংস্থান হারিয়ে গ্রাম ছেড়ে মানুষ শহরমুখী হওয়ায় গ্রাম থেকে শহরমুখী অভিবাসন এখন একটি বড় মানবিক সংকটে রুপ নিয়েছে। উপকূলের মানুষের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষার প্রধান ঢাল হলো বেড়িবাঁধ। কিন্তু বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (ইডউই) তথ্য ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, উপকূলীয় এলাকায় বর্তমানে প্রায় ২৪০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ চরম ঝুঁকিপূর্ণ বা অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।

বক্তারা অভিযোগ করেন, ভাঙনপ্রবণ এই বাঁধগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব রয়েছে। সিডর, আইলা ও রেমালের মতো বড় বড় ঘূর্ণিঝড়ের ধাক্কায় বাঁধগুলো ক্রমান্বয়ে আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে সামান্য জোয়ারের পানিতেই বাঁধ ভেঙে বিস্তর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে, যা উপকূলীয় অঞ্চলের সামগ্রিক সুরক্ষাবলয়কে পুরোপুরি ভেঙে ফেলেছে। এর ফলে লোনা পানি ঢুকে নষ্ট হচ্ছে সুপেয় পানির উৎস, ছড়াচ্ছে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন জলবাহিত রোগ। পুষ্টিহীনতার শিকার হচ্ছে নারী ও শিশুরা।
উপকূলীয় এলাকার সংকটের বিপরীতে জাতীয় বাজেটে বরাদ্দের চিত্রটি চরম হতাশাজনক বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়। গত ১০ বছরের বাজেট বরাদ্দ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দেশের মোট জাতীয় বাজেট ক্রমান্বয়ে বাড়লেও জলবায়ু ও পরিবেশ খাতের বরাদ্দ প্রতি বছর কমছে।

সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের সুরক্ষার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, সুন্দরবন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের জন্য শুধু একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই নয়, এটি একটি প্রাকৃতিক প্রাচীর। যুগে যুগে সব বড় ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস নিজের বুকে পেতে নিয়ে দেশকে রক্ষা করে আসছে সুন্দরবন।

জাতীয় অর্থনীতিতেও এই বনের অবদান অপরিসীম। সুন্দরবনের মাছ, মধু, কাঠ ও বনজ সম্পদ থেকে প্রতি বছর দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থনৈতিক মূল্য যুক্ত হচ্ছে। এছাড়া, উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৩৫ থেকে ৫০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তাদের জীবিকার জন্য এই সুন্দরবনের ওপরই সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। সুন্দরবনের পরিবেশ বিপন্ন হলে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে যাবে।

সংবাদ সম্মেলনে উপকূলের সুরক্ষায় সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার তাগিদ দেওয়া হয়। মাঠপর্যায় থেকে নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং স্থানীয় জনগণের অভিজ্ঞতা ও চাহিদাকে আসন্ন জাতীয় বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করাসহ উপকূলের মানবিক ও পরিবেশগত সংকট নিরসনে আসন্ন জাতীয় বাজেটে একটি ‘বিশেষ উপকূলীয় তহবিল’ হিসেবে কার্যকর বরাদ্দ দেওয়ার আহবান জাানো হয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অন্যান্য লেখা সমূহ