
#উপজেলা প্রশাসনের অলিখিত অনুমতিতে লাখ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন, আছে কিছু দলীয় লোকের সম্পৃক্ততা- ড. মনিরুজ্জামান
# নওয়াবেঁকীতে বালুর পাহাড়, ভাগ-বাটোয়ারার অভিযোগ শাসক দলের ৪নেতার বিরুদ্ধে।
#নদীভাঙন ও বেড়িবাঁধ বিপর্যয়ের শঙ্কা বিশিষ্টজনদের, বালু উত্তোলন বন্ধের ঘোষণা বিভাগীয় কমিশনারের।
শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদ শ্যামনগরের সুরক্ষাকবচ খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ নদ যেন পরিণত হয়েছে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভয়ারণ্যে। রাতের আঁধারে ড্রেজার মেশিন ও বলগেট ব্যবহার করে নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে লাখ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে শাসকদলের চক্রের বিরুদ্ধে। উপজেলার শীর্ষ ৪ নেতার সম্পৃক্ততা থাকায় ব্যবস্থা নিতে পারছে না স্থানীয় প্রশাসন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলা যুবদল নেতা হাবিবুল্লাহ’র নেতৃত্বে বালু লুট চলছে। উত্তোলিত বালু কার্গোযোগে এনে নওয়াবেঁকী বাজারসংলগ্ন এলাকায় স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। সেখান থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বালু বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের চোখের সামনেই দীর্ঘদিন ধরে চলছে এই কর্মকাণ্ড। মাঝেমধ্যে নামমাত্র অভিযান পরিচালিত হলেও বন্ধ হচ্ছে না বালু উত্তোলন। বরং রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় একটি চক্র রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি প্রশাসনের কিছু ব্যক্তি ও প্রভাবশালী মহলের মধ্যে অর্থ ভাগ-বাটোয়ারার অভিযোগও করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে নদীর তলদেশ থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিতে পারে। বিলীন হতে পারে বসতভিটা, ফসলি জমি ও জনপদ। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে উপকূলীয় বেড়িবাঁধ, যার ওপর নির্ভর করছে হাজার হাজার মানুষের জীবন ও জীবিকা।
যেসব পয়েন্টে চলছে বালু উত্তোলনের অভিযোগ: সরেজমিন অনুসন্ধানে শ্যামনগর উপজেলার একাধিক নদী ও চরাঞ্চলে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের চিত্র পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, কাশিমাড়ি ইউনিয়নের ঝাপালির চর, বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দুর্গাবাটি চর, পদ্মপুকুর ইউনিয়নের কামালকাটি ও পাতাখালি, গাবুরা ইউনিয়নের চৌদ্দরশি চর এবং জেলেখালী এলাকায় খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ নদ থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এসব স্থান থেকে উত্তোলিত বালু কার্গোযোগে আটুলিয়া ইউনিয়নের নওয়াবেঁকী বাজারসংলগ্ন জামান ইটভাটা এলাকার কাছে নিয়ে আসা হচ্ছে। খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধ ঘেঁষে একাধিক স্থানে বালুর বিশাল স্তূপ তৈরি করা হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ৮ থেকে ১০টি স্থানে বালু মজুত করে রাখা হয়েছে। প্রতিদিন এসব স্তূপ থেকে বিভিন্ন স্থানে বালু বিক্রি করা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রতি ঘনফুট বালু প্রায় ৭ টাকা দরে বিক্রি হয়। প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ: স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাবিবুল্লাহ, জামান, বিল্লাল, সোহেল, মুজিবর, মুছা, রনি ও জনিসহ কয়েকজনের নাম বালু উত্তোলন ও বিপণন কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত হিসেবে উঠে এসেছে। আটুলিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা হাবিবুল্লাহ নওয়াবেঁকী বাজারসংলগ্ন এলাকায় বালু বিক্রির কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এই কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে আরও প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তি রয়েছেন। প্রতিদিন বালু বিক্রির বিপুল অর্থ নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিভিন্ন মহলে ভাগ-বাটোয়ারা করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, অবৈধ বালু উত্তোলনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট একটি চক্র রাতারাতি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছে। জমি, বাড়ি, বিলাসবহুল গাড়ি ও ব্যাংক ব্যালেন্স গড়ে তোলার কথাও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচিত হচ্ছে। বেড়িবাঁধের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে আতঙ্ক: শ্যামনগর বাংলাদেশের অন্যতম নদীবেষ্টিত ও সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় উপজেলা। এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকা নদী, কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও বেড়িবাঁধের নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর তলদেশ থেকে অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের কারণে বিভিন্ন স্থানে নদীর পাড় ও বেড়িবাঁধে ভাঙন ও ধসের ঝুঁকি বাড়ছে। প্রতিবছর বেড়িবাঁধ ভাঙনের কারণে হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জোয়ারের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে মাছের ঘের প্লাবিত হওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষক ও মৎস্যচাষিরা।
এদিকে গাবুরা ইউনিয়নে হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও উন্নয়নকাজ চলমান রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নদীর কাছাকাছি এলাকায় অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের স্থায়িত্ব ও উপকূলীয় জনপদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। ভূতাত্ত্বিক ও পরিবেশগত বিবেচনায় নদীর স্বাভাবিক তলদেশের গঠন পরিবর্তিত হলে স্রোতের গতিপথ, নদীর তীরের স্থিতিশীলতা এবং পাড়ের ক্ষয়প্রবণতায় পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে ভাঙনপ্রবণ উপকূলীয় এলাকায় অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। এর পাশাপাশি লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ, কৃষিজমির ক্ষয়, মৎস্যসম্পদের ক্ষতি এবং নদীনির্ভর জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সুন্দরবনসংলগ্ন এই অঞ্চলে নদীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রভাব পড়তে পারে সামগ্রিক উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রে। বালুমহাল ইজারা না থাকার পরও কীভাবে চলছে উত্তোলন?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলা ১৪৩০ থেকে ১৪৩২ সাল পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট এলাকায় বালুমহাল ইজারা দেওয়ার তথ্য রয়েছে। পরবর্তী সময়ে পরিবেশগত ঝুঁকি ও নদীভাঙনের আশঙ্কায় ইজারা বাতিলের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। চলতি অর্থবছরে সংশ্লিষ্ট নদীগুলোতে বৈধ বালুমহাল ঘোষণা ও ইজারার অনুমোদন না থাকার দাবি করেছেন স্থানীয়রা। এমন পরিস্থিতিতে কার অনুমোদনে, কোন শর্তে এবং কীভাবে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে সুন্দরবনসংলগ্ন সংবেদনশীল এলাকায় বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে আইনগত নিষেধাজ্ঞা ও পরিবেশগত বিধিনিষেধের বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই করে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
আইন কী বলছে? বাংলাদেশের বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ এবং এর সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, নির্ধারিত শর্ত ও অনুমোদন ছাড়া বালু বা মাটি উত্তোলন দণ্ডনীয় অপরাধ। আইন অনুযায়ী, নিষিদ্ধ বা অনুমোদনহীন স্থান থেকে বালু উত্তোলন এবং বিধিবহির্ভূতভাবে ড্রেজার ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আইনের ১৫ ধারার প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী অপরাধের ধরন ও পরিস্থিতি বিবেচনায় কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড এবং অপরাধে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি জব্দ বা বাজেয়াপ্ত করার বিধান রয়েছে। শ্যামনগরের নদীগুলোতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
শ্যামনগর নীলডুমুর ১৭ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল খন্দকার আবু সহল আব্দুল্লাহ বলেন, “বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সিভিল প্রশাসনের আওতাধীন। আমরা সীমিত জনবল নিয়ে সীমান্তে, বিশেষ করে চোরাচালান প্রতিরোধে কাজ করছি। তারপরও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।” শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামসুজ্জামান কনকের বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজের বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনিও ফোন রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল্লাহ হারুন বলেন, “নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। ইউএনও এবং এসিল্যান্ডকে বলে দিচ্ছি, বালু উত্তোলন বন্ধ করার জন্য।” তিনি অবৈধভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান।
প্রশ্ন এখন একটাই—কার ছত্রছায়ায় চলছে এই বালু লুট? উপকূলীয় জনপদকে নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষার জন্য যখন সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করছে, তখন সেই বাঁধের পাশেই নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলনের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকার পরও কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক পয়েন্টে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন চলছে? কারা এই কর্মকাণ্ডের পৃষ্ঠপোষক? কোথায় যাচ্ছে উত্তোলিত বালু বিক্রির অর্থ? আর অভিযোগের পরও কেন কার্যকরভাবে বন্ধ হচ্ছে না এই কর্মকাণ্ড? এলাকার সচেতন মহল, পরিবেশকর্মী ও সাধারণ মানুষ অবিলম্বে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, সংশ্লিষ্ট নদীগুলোতে সরেজমিন তদন্ত, বালুর স্তূপ ও পরিবহন কার্যক্রমের হিসাব যাচাই, ড্রেজার ও বলগেট জব্দ এবং অভিযোগের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
তাদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট চলতেই থাকবে, অন্যদিকে তেমনি একদিন নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে শ্যামনগরের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় জনপদ। প্রশাসনের আশ্বাস নয়, এবার প্রয়োজন দৃশ্যমান অভিযান ও জবাবদিহি—এমনটাই প্রত্যাশা শ্যামনগরের উপকূলবাসীর।
এব্যাপারে সাতক্ষীরা-৪ আসনে নির্বাচনে ধানের শীষ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীতাকারী ড. মনিরুজ্জামান অকপটে বালু উত্তোলনে জড়িত ব্যক্তিদের নাম প্রকাশ করে বলেন, এই অনিয়মের বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ করে চলেছি। আইনমন্ত্রী সাতক্ষীরা আসলে আমি দুটি বিষয়ে কথা বলেছিলাম। একটি হল, বালু উত্তোলনে অনিয়ম, দ্বিতীয়টি হল সুন্দরবনে জলদস্যুর তৎপরতা বৃদ্ধি। দলের কতিপয় ব্যক্তি প্রশাসনের সাথে যোগসাজস করে বালু উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রশাসনের অলিখিত অনুমতি আছে। এই অঞ্চলে বালুমহল টেন্ডার হতো। সরকার কোটি টাকার উপর রাজস্ব পেতো। টেন্ডার বন্ধ করা হয়েছে। উন্নয়ন কর্মকান্ডের অজুহাত তুলে প্রশাসন বালু উত্তোলন বন্ধে অনাগ্রহী। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে দফায় দফায় কথা বলেও কোন প্রতিকার মিলছে না। চলবে……